দেশের শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং বেসরকারি খাতের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র শীর্ষ নেতৃত্বে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান শেষ পর্যন্ত তাঁর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
রবিবার (২৪ মে ২০২৬) তিনি সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে তাঁর আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন। একই সাথে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানের পদত্যাগ ও অপসারণের গুঞ্জন নিয়ে পুরো ব্যাংকিং পাড়ায় চরম ধোঁয়াশা এবং অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বিগত ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দেশের পটপরিবর্তনের পর অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমানকে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে পরিচালনা পর্ষদের সর্বসম্মতিক্রমে তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব পালন শুরু করেন, যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর।
তবে চলতি বছরের শুরুতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমান যোগ দেওয়ার পর থেকেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন গভর্নরের মেয়াদে ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক পরিচালনা, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং ঋণ বিতরণ ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ মহলের সাথে ব্যাংকটির বর্তমান উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তীব্র মতবিরোধ ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই সম্পূর্ণ অনলাইনে পরিচালনা পর্ষদের সভায় যুক্ত থাকার বিশেষ শর্তে প্রায় দেড় মাসের লম্বা ছুটি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান। ঠিক একই সময়ে ব্যাংকটির বর্তমান এমডি ওমর ফারুক খানকেও রহস্যজনকভাবে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। গত ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভায় তাঁদের এই দীর্ঘ ছুটির বিষয়টি তড়িঘড়ি করে অনুমোদন করা হয়েছিল।
এমন থমথমে পরিস্থিতির মাঝেই আজ (রবিবার) ইসলামী ব্যাংকের দিলকুশাস্থ প্রধান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি সভা ডাকা হয়েছিল। কিন্তু এই সভাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের নিচে সাধারণ গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ জড়ো হয়ে আকস্মিক বিক্ষোভ ও আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনকারীরা লাউডস্পিকারে স্লোগান দিয়ে এমডি ওমর ফারুক খানকে কোনো অবস্থাতেই পদত্যাগ না করার এবং ব্যাংকের স্বার্থে তাঁকে দায়িত্বে বহাল রাখার জোর দাবি জানান। একই সাথে তাঁরা বিদেশে অবস্থানরত চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও উদাসীনতার অভিযোগ তুলে তাঁর স্থায়ী পদত্যাগ ও অপসারণ দাবি করেন।
এই ত্রিমুখী অস্থিরতা ও মাঠপর্যায়ের তীব্র আন্দোলনের মুখে আজ শেষ পর্যন্ত বিদেশে অবস্থানরত চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান ইমেইল ও বিশেষ মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। অন্যদিকে, বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে যে, ছুটিতে থাকা এমডি ওমর ফারুক খানও পরিচালনা পর্ষদের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে রেখেছেন। তবে প্রধান কার্যালয়ের নিচে তীব্র উত্তেজনা এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে আজ পূর্বনির্ধারিত পরিচালনা পর্ষদের পুরো সভাই বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ফলে পর্ষদ কর্তৃক এমডির পদত্যাগপত্র গ্রহণ বা এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো আইনি সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তাঁর অবস্থান নিয়ে ব্যাংক খাতের ভেতরে ও বাইরে এক বিশাল ধোঁয়াশা ও কুয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভট এই প্রশাসনিক সংকটের বিষয়ে জানতে বিদায়ী চেয়ারম্যান এবং এমডির সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কাউকেই পাওয়া যায়নি।












