রাজস্ব আয়ের রেকর্ড ঘাটতিতে সর্বনিম্নে নামল এডিপি- বাস্তবায়ন

DSJ FB Photo Card May 6 2026 BangladeshEconomy
ডিএসজে কোলাজ

তীব্র অর্থসংকট, রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের চরম ধীরগতির এক অভূতপূর্ব ত্রিমুখী সংকটে পড়েছে সরকার। একদিকে নানামুখী অর্থনৈতিক মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই (জুলাই-এপ্রিল) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে, সরকারের কোষাগার শূন্য থাকায় এর সরাসরি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের ওপর।

অর্থবছর শেষ হতে বাকি আর মাত্র দুই মাস। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে সংশোধিত এডিপির লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সরকারকে এখন উন্নয়ন খাতে ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। একই সাথে বাজেট সচল রাখতে এনবিআরকে মে ও জুন মাসে আহরণ করতে হবে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১ কোটি টাকার অসম্ভব অঙ্কের রাজস্ব। সংকুচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মেগা ঘাটতি পূরণ এবং অবাস্তব খরচের লক্ষ্য অর্জনকে প্রায় ‘অসম্ভব’ বলে মনে করছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকেরা।

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে উন্নয়ন খাতে মোট ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮৬ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। মূল এডিপির আকার ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করে সংশোধিত এডিপির লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ কোটি টাকায় নামানো হলেও এখনও বাকি রয়ে গেছে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছর পূর্ণ করতে হলে মে ও জুন—এই দুই মাসে সরকারকে গড়ে প্রতি মাসে ৬১ হাজার কোটি টাকা করে ব্যয় করতে হবে।

অথচ চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই উন্নয়ন ব্যয় ১০ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকার ঘর ছাড়াতে পারেনি। এমনকি গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির ৬৮ শতাংশ বাস্তবায়নের রেকর্ড স্পর্শ করতে হলেও বাকি দুই মাসে আরও প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। একক মাস হিসেবে গত এপ্রিলে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ২২ শতাংশ, যা আগের মাস মার্চের (৫.৮৮ শতাংশ) চেয়েও কম। ফলে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে এসে ব্যয়ের গতি বাড়ার বদলে উল্টো স্থবিরতা নেমে এসেছে। আইএমইডির তথ্যমতে, গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের তুলনায় এবার প্রকৃত উন্নয়ন ব্যয় কমেছে ৮ হাজার ৯২ কোটি টাকা।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক ব্যয়ের চিত্রেও দেখা গেছে চরম বৈষম্য। ১০ মাসে সবচেয়ে বেশি ২১ হাজার ১০৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ৯ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। এছাড়া বিদ্যুৎ বিভাগ ৯ হাজার ৩৫৯ কোটি এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ব্যয় করেছে ৭ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা।

বিপরীতে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত সামাজিক খাতগুলোর চিত্র অত্যন্ত করুণ ও অনগ্রসর। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১০ মাসে ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ৬৯৩ কোটি এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ব্যয় করেছে মাত্র ২৩৯ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে এমন ধীরগতি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

এডিপির এই পঙ্গুত্ব দশা ও অর্থসংকটের মূল কারণ উন্মোচিত হয়েছে এনবিআরের প্রতিবেদনে। গত বুধবার প্রকাশিত এনবিআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু আয়কর, মূসক (ভ্যাট) ও শুল্ক মিলিয়ে প্রকৃত আহরণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকায়, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৪ দশমিক ২২ শতাংশ কম।

বেসরকারি খাতে ঋণ সংকোচন এবং উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি তলানিতে ঠেকার কারণে কাস্টমস বা আমদানি শুল্ক খাতে ৮ দশমিক (৯২ শতাংশের বড় ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত বছরের ২৯ হাজার ৯৩ কোটি টাকার বিপরীতে এবার এসেছে আরও কম। একক মাস এপ্রিলে ৪৫ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৯ হাজার ৬০ কোটি টাকা। এপ্রিলে স্থানীয় সম্পূরক শুল্ক ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং মূসক (ভ্যাট) আদায় ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকলেও গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের তুলনায় এবার গড়ে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে, যা লক্ষ্য পূরণের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি ও রাজস্ব সংকটের কারণে বাজারে তারল্য চাপ বাড়ছে, কারণ সরকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নিচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ তাদের মাসিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রকল্প অনুমোদন ও শুরুতে বিলম্ব, তহবিল ছাড়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাবের কারণে বিনিয়োগ প্রবাহ কমছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন দেশের এই প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কড়া সমালোচনা করে বলেন, অনেক প্রকল্প বছরের পর বছর ধরে চললেও বাস্তব অগ্রগতি খুব সীমিত। যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন হার ১০ শতাংশের নিচে, সেগুলো অনতিবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সাথে ৩০ শতাংশের কম অগ্রগতির প্রকল্পগুলোর যৌক্তিকতা নতুন করে যাচাই করা উচিত।

তিনি রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া অপ্রয়োজনীয় ও অনুত্পাদনশীল প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাদ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বেশি বরাদ্দ ও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। অথচ এই বাস্তবতাকে আমলে না নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট এবং রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top