উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ধারাবাহিক চাপ এবং রাজস্ব আদায়ের চড়া লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে নতুন নির্বাচিত সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এবং বাংলাদেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সম্ভাব্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল ব্যয়ের মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন, যা দেশের মোট জিডিপি বা দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
চলতি সময়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক জিডিপির আকার বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৬৮ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরে ছিল প্রায় ৬০ লাখ কোটি টাকা। অর্থনীতির এই বর্ধিত পরিধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং ভঙ্গুর জনআস্থা পুনরুদ্ধার করতে বাজেটের আকার আগের চেয়ে অনেক বড় করা হলেও এর অর্থায়ন ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বড় ধরনের তাত্ত্বিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব নীতিতে বড় ধরনের সংস্কার এবং করের ভিত্তি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশনের যে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ এনবিআর সাজিয়েছে, এই বাজেট মূলত তার একটি শক্ত পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
বাজেটের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের বিশাল কাঠামোর অভ্যন্তরীণ চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে সরকারের সম্ভাব্য নিজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, বাজেটের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশ অর্থ সরকার নিজস্ব রাজস্ব ও কর আদায়ের মাধ্যমে সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। এর ফলে বিশাল এই বাজেটে সামগ্রিক নিট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের একটি ঋণের চাপ সৃষ্টি করবে।
এই বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার বরাবরের মতোই অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল হতে যাচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মোট ঘাটতির প্রায় ৫২ শতাংশ বা ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর সিংহভাগই নেওয়া হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে এবং বাকি অংশ আসবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রয় ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ঋণের তহবিল গঠনের মাধ্যমে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে কিছুটা সংকুচিত করতে পারে।
অন্যদিকে, ঘাটতি অর্থায়নের বাকি ৪৮ শতাংশ পূরণ করা হবে বৈদেশিক ঋণ, সহজ শর্তের অনুদান এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর বাজেট সহায়তার তহবিল থেকে। এ খাতে সম্ভাব্য অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। বিশ্ববাজারের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দেশের অভ্যন্তরে ডলার সংকটের এই ক্রান্তিকালে এই পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ সময়মতো ছাড় করানো এবং তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা অর্থমন্ত্রীর জন্য অন্যতম প্রধান একটি কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে।
রাজস্ব আয়ের অভ্যন্তরীণ কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের মোট আয়ের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮৭ শতাংশ একাই জোগান দেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এনবিআরকে এবার রেকর্ড ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এনবিআর বহির্ভূত কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ৪ শতাংশ) এবং কর ব্যতীত বিভিন্ন সরকারি সেবা ও লভ্যাংশ বাবদ কর বহির্ভূত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ৯ শতাংশ)।
এবারের বাজেটে নতুন সরকারের প্রধান রাজনৈতিক চালিকাশক্তি হচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা, যা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষীভাবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। অথচ বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রবৃদ্ধির গ্রাফ এক লাফে অনেক ওপরে টেনে তোলার পরিকল্পনা করলেও আন্তর্জাতিক স্তরে এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চরম সন্দেহ ও ভিন্ন পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ আরও কঠোর পূর্বাভাস দিয়ে জানিয়েছে, সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক সূচক এবং সংস্কারের গতি মন্থর থাকায় প্রবৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে। আন্তর্জাতিক এই পূর্বাভাসগুলোর তুলনায় সরকারের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২ শতাংশ বেশি হওয়ায় বাজেট বাস্তবায়নের বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, এই বাজেট কেবল এক বছরের হিসাব নয়, বরং ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি। আগামীকালকের আনুষ্ঠানিক বাজেট বক্তৃতায় করের জাল সম্প্রসারণ, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ শুল্ক রেয়াত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে অর্থমন্ত্রী কী ধরনের বিশেষ প্রণোদনা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের ঘোষণা দেন, এখন তার ওপরেই নির্ভর করছে দেশের ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি ও সামগ্রিক বেসরকারি খাতের ভবিষ্যৎ।













