জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট। তিন সপ্তাহের দীর্ঘ আলোচনা, সমালোচনা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর পর আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বাজেটটি পাস হয়। নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন ১ জুলাই থেকে এই বাজেট আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
এটি দেশের ৫৫তম এবং চলতি বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে এই বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
পাস হওয়া নতুন বাজেটের আকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের (৮ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা) চেয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিশাল এই বাজেটে পরিচালন খাতে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ (এডিপি) অন্যান্য উন্নয়ন খাতে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের দায়ের কারণে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এবারের বাজেটে অনুদানসহ মোট প্রাপ্তির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ লাখ ১,১৫০ কোটি টাকা, যার মধ্যে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। রাজস্বের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮৬.১ শতাংশ বা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। বাকি ৯.৪ শতাংশ রাজস্ব আসবে অ-কর খাত থেকে।
নতুন বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩.৬ শতাংশ। এই বিশাল ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে মূলত রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার ওপর নির্ভর করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
বাজেট পাসের আগের দিন গতকাল সোমবার সংসদে অর্থবিল-২০২৬ পাসের মাধ্যমে কর ও শুল্ক নীতিতে মোট ৬৮টি সংশোধনী আনা হয়েছে। বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগের মুখে বেশ কয়েকটি বিতর্কিত প্রস্তাব থেকে সরকার শেষ মুহূর্তে সরে এসেছে। এসব সংশোধনীর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিয়ে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা।
এছাড়া নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে জমি বা ফ্ল্যাট নিবন্ধনের সুযোগ সীমিত করার যে বিতর্কিত প্রস্তাব ছিল, তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনটি নির্দিষ্ট খাতে প্রস্তাবিত নতুন ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর আরোপের সিদ্ধান্ত থেকেও সরকার পিছিয়ে এসেছে।
বাজেট পাসের আগে সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন গঠনমূলক মতামত ও সুপারিশ বিবেচনায় নিয়েই অর্থবিলে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও পরিমার্জন আনা হয়েছে।
বাজেট উপস্থাপনের পর টানা তিন সপ্তাহ ধরে সংসদ সদস্যরা এর ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই আলোচনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, স্বতন্ত্র ও বিরোধী দলের সদস্যরা অংশ নিয়ে করনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।
আজ বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে ৫ ৯টি মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করা হয়, যা কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয়। এসব মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা মোট ১ হাজার ৩৪২টি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করলেও কণ্ঠভোটে সবকটি প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। সবশেষে ‘নির্দিষ্টকরণ বিল-২০২৬’ পাসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট অনুমোদনের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।













