আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে ‘পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামো’র (২০২৫-২০৩০) খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার। গত বুধবার পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে ৩৬ সদস্যের অ্যাডভাইজরি কমিটির প্রথম সভায় এই উচ্চাভিলাষী রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। এই মহাপরিকল্পনার মূল স্তম্ভ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের আমূল পরিবর্তন এবং প্রতি বছর ২০ লাখ কর্মীকে বিদেশের শ্রমবাজারে পাঠানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয়, এই কাঠামোর মাধ্যমে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অতীতের বাস্তবতাবিবর্জিত ও কেবল সংখ্যাভিত্তিক পরিকল্পনার বিপরীতে এবার একটি জনসম্পৃক্ত এবং বাস্তবায়নযোগ্য রূপরেখা তৈরির অঙ্গীকার করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।
প্রস্তাবিত খসড়ায় আইসিটি খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী পাঁচ বছরে ১০ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-এর মতো বিশেষায়িত পাঁচটি কারিগরি ক্ষেত্রে ২ লাখ দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে। বাকি ৮ লাখ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে ফ্রিল্যান্সিং খাতের মাধ্যমে। ফ্রিল্যান্সারদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে ‘পেপাল’ ব্যবহার ও জাতীয় ই-ওয়ালেট প্রবর্তনের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে প্রতি বছর ২০ লাখ কর্মীকে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। এদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করতে স্বল্পমেয়াদি ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষ জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক গতিশীলতা আনতে সরকারি চাকরিতে থাকা ৫ লাখের বেশি শূন্য পদ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দ্রুত পূরণ করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার যে অমিল অতীতে ছিল, তা সংস্কার করে জনগণের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাকের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে ওষুধ, চামড়া, পাদুকা এবং কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির ০.৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। ব্যবসা সহজ করতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধন এবং ৭ দিনের মধ্যে ওয়ার্ক পারমিট নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া পুঁজিবাজারের অনিয়ম তদন্ত এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল কমার্শিয়াল কোর্ট’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে এই খসড়ায়।
জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পাশাপাশি নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন ও খাদ্য-জ্বালানির কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সমুদ্রসীমার তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও মৎস্য আহরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘ব্লু ইকোনমি’কে জাতীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতি থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত এবং মুদ্রাস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে, তবে তা জনগণের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারের মাধ্যমে অর্জিত হবে। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ কর্মসূচির আওতায় ই-কমার্স ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা থাকবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, সিপিডির ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, মোস্তাফিজুর রহমান, অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ্সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা এই সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রমুখ। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই পরিকল্পনা প্রণয়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সামাজিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।













