২০২৬ সালের শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক রূপান্তরকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আইএমএফ-এর নির্বাহী সারসংক্ষেপ এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক—উভয় দিক থেকেই বহুমুখী ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বর্তমানে গত ১৫ বছরের মধ্যে (কোভিডকাল বাদে) সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশে নেমে আসার পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা ৪.৫ শতাংশে উন্নীত হলেও পুরো বছরের জন্য ৩.৯ শতাংশের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। প্রবৃদ্ধির এই ধীরগতির সমান্তরালে বড় আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে গড় মুদ্রাস্ফীতি ৮.৫ শতাংশে অবস্থান করছে। সরবরাহ চেইনের অদক্ষতা এবং জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আইএমএফ-এর মতে, আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতি বাংলাদেশের জন্য আগামী দিনগুলোতে আরও বড় বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর চলমান বসন্তকালীন সভা উপলক্ষে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ বা ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। রিপোর্টের সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা। ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০.৬ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট ও সু শাসনের অভাব প্রকট হয়েছে। আইএমএফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই খাতে কঠোর তদারকি এবং পর্যাপ্ত মূলধন ও রিজার্ভ বাফার বজায় রাখা না গেলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ধসে পড়তে পারে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং তারল্য সংকট আমানতকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে আরেকটি গভীর ক্ষত হলো রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হওয়ায় কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আইএমএফ-এর পরামর্শ অনুযায়ী, দ্রুত রাজস্ব সংস্কার এবং কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন না করলে সরকার তার উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে চরম সংকটে পড়বে। রাজস্ব আদায়ের এই দুর্বলতা সরকারকে ব্যাংক ঋণ নিতে বাধ্য করছে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে সংকুচিত করছে।
বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটাই এবং এলএনজির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে যদি বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায়, তবে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যেতে পারে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে এবং ২০২৭ সাল নাগাদ কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি জিডিপির ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। রেমিট্যান্স প্রবাহে ২১.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে রিজার্ভকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি সেই স্বস্তি কেড়ে নিতে পারে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের একটি ‘ডুয়াল স্ট্রাকচার’ বা দ্বিমুখী রূপ উঠে এসেছে। দেশের মাত্র ১০ শতাংশ বড় কোম্পানি মোট বিক্রয়ের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু তারা কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে মাত্র ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও তাদের উৎপাদনশীলতা অত্যন্ত কম। এছাড়া বাংলাদেশে উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপকদের সময়ের প্রায় ১৩ শতাংশ ব্যয় হয় সরকারি নিয়মকানুন সামলাতে, যাকে ‘রেগুলেটরি টাইম ট্যাক্স’ বলা হচ্ছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি এবং বিনিয়োগের পথে বড় বাধা।
বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য আইএমএফ-এর নির্বাহী পর্ষদ দ্রুত রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের কঠোর তদারকি, ব্যবসার জটিল নিয়মকানুন সহজ করা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিকে আরও কঠোর করার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করা প্রয়োজন যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক ধাক্কা থেকে রক্ষা পায়। বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলায় একটি সুসংগত স্থিতিশীলতা কৌশল গ্রহণ করাই এখন বাংলাদেশের জন্য প্রধান কাজ।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: যুদ্ধের ছায়ায় বিশ্ব অর্থনীতি
আইএমএফ-এর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করে ২০২৬ সালের জন্য ৩.১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে প্রত্যাশিত ৩.৪ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় বা এর পরিধি আরও বৃদ্ধি পায়, তবে প্রবৃদ্ধির হার ২ শতাংশেও নেমে আসতে পারে। এমনটি ঘটলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের ওপর বড় ধরনের আঘাত আসবে।
জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে। আইএমএফ সতর্ক করেছে যে, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে রাখতে বাধ্য হবে, যা সাধারণ মানুষের ঋণ গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দেবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।
ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বিধিনিষেধ বিশ্ব অর্থনীতিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এখন বৈশ্বিক সহযোগিতার চেয়ে নিজেদের বাজার রক্ষায় বেশি মনোযোগী হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। আইএমএফ-এর মতে, এই ধরনের বাণিজ্যিক বিচ্ছিন্নতা উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
আর্থিক বাজারের অস্থিরতা এবং মার্কিন ডলারের মানের ওঠা-নামাও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আইএমএফ তাই দেশগুলোকে বাফার বা আর্থিক সুরক্ষা কবচ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে যাতে তারা বড় ধরনের কোনো ধাক্কা সামলাতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি মনে করে, দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সংহতি বাড়ানো এবং স্বচ্ছ বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন করা না গেলে বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনরায় আগের কক্ষপথে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট নিরসনই এখন বৈশ্বিক পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি।













