বিশ্বসেরা প্রযুক্তি নিয়েও কেন ধুঁকছে জিপিএইচ ইস্পাত

Web Photo Card May 2026 GPH
ডিএসজে কোলাজ

বাংলাদেশের স্টিল সেক্টরে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের উত্থান ছিল অনেকটা রূপকথার মতো, যা কী না অত্যাধুনিক ‘কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস’ ও ‘উইনলিংক’-এর মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রযুক্তিতে ভর করে ডানা মেলেছিল। এক দশক আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে যখন তারা এশিয়ার প্রথম এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত কারখানা স্থাপনের ঘোষণা দেয়, তখন মনে করা হয়েছিল এটি দেশের ইস্পাত শিল্পে এক বিপ্লব ঘটাবে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের কয়েক বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, সেই বিশ্বসেরা প্রযুক্তির ভারী বোঝা ও ঋণের মরণফাঁদ কোম্পানিটিকে বড় ধরনের সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

উচ্চমূল্যের বিদেশি যন্ত্রপাতি আর শত শত কোটি টাকার ঋণের টাকায় কেনা প্রযুক্তির বিপুল ভার এখন কোম্পানিটির আর্থিক ভিতকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে, যার ফলে গৌরবোজ্জ্বল উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বাজারে এর পণ্য বিক্রিতে নজিরবিহীন ধস নেমেছে।

কোম্পানির প্রকাশিত চলতি ২০২৫-২৬ হিসাববছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই আশঙ্কাজনক ও ভঙ্গুর সামষ্টিক চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে জিপিএইচ ইস্পাতের পণ্য বিক্রির পরিমাণ বছর ব্যবধানে ২৬ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এ সময়ে কোম্পানিটি তাদের সর্বোচ্চ প্রযুক্তির রড ও ইস্পাত পণ্য বিক্রি থেকে নিট আয় করেছে ৩,২১৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের ৪,৩৯৯ কোটি টাকার তুলনায় ১,১৮৫ কোটি টাকা কম। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানির আয় এমন মারাত্মকভাবে ধসে পড়ায় কোম্পানিটি আবার নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের চক্রে পতিত হয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১ সালে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস অ্যান্ড উইনলিংক (ইএএফ) নামের বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত কারখানায় বাণিজ্যিকভাবে রড উৎপাদন শুরু করে। মূলত ২০২৩-২৪ হিসাববছরে বিক্রিতে সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছিল জিপিএইচ। সে বছর কোম্পানিটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৫ হাজার কোটি টাকার আয়ের ম্যাজিক মাইলফলক অতিক্রম করে। এর পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও প্রায় একই পরিমাণের বিক্রির ধারা ধরে রাখতে সক্ষম হলেও কোম্পানিটির বিশাল ঋণের নিচে চাপা পড়ে আয়ের সেই সাফল্য। আর চলতি হিসাববছরের প্রথম নয় মাসে এসে ২৬ শতাংশ বিক্রি একধাক্কায় কমে যাওয়ায় তাদের সামগ্রিক পরিচালন মুনাফাকে তা সরাসরি পঙ্গু করে দিয়েছে।

অথচ একই সময়ে জিপিএইচ ইস্পাতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং খাতের একক ‘মার্কেট লিডার’ বিএসআরএম গ্রুপের দুই কোম্পানি—বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড ও বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড উৎপাদিত রড বিক্রিতে ব্যাপক ও ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে। চলতি হিসাববছরের প্রথম নয় মাসে রড বিক্রি থেকে কোম্পানি দুটির আয় বছর ব্যবধানে যথাক্রমে ৩৬ শতাংশ ও ১৫.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানি দুটির নিট মুনাফাতেও শক্তিশালী উল্লম্ফন দেখা গেছে।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের রডের সামগ্রিক মার্কেট সাইজ বর্তমানে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকার, যার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ এককভাবে দখলে রেখেছে বিএসআরএম গ্রুপ। বিপরীতে, ২০২৪-২৫ হিসাববছর পর্যন্ত জিপিএইচ ইস্পাতের দখলে ছিল দেশের মোট রড বাজারের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ শেয়ার, যা এখন বিক্রি ধসের কারণে আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিএসআরএম ও জিপিএইচ ইস্পাত উভয় কোম্পানিই তাদের স্ক্র্যাপ মেল্টিং বা লোহা গলানোর স্তরে অস্ট্রিয়ার বিশ্বখ্যাত ‘প্রাইমেটালস টেকনোলজিস’-এর তৈরি সর্বাধুনিক এবং পরিবেশবান্ধব ‘কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা সনাতন ফার্নেসের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। তবে রড উৎপাদনের সামগ্রিক অটোমেশন ও লাইনআপ লাইনের মেলবন্ধনে জিপিএইচ ইস্পাত প্রযুক্তিগতভাবে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে; কারণ তারা বিলেট কাস্টিং ও রড রোলিংয়ের মাঝে সরাসরি সংযোগ ঘটাতে অত্যন্ত আধুনিক ‘উইনলিংক প্রযুক্তি’ ব্যবহার করে, যা সনাতন রি-হিটিং ফার্নেসের প্রয়োজনীয়তা দূর করে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে প্রায় আড়াই গুণ বেশি গ্যাস সাশ্রয় নিশ্চিত করে।

যেকোনো নির্মাণে বিএসআরএম দেশের বাজারে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও গুণগত মানসম্পন্ন ৫০০-গ্রেডের রড সরবরাহে ‘মার্কেট লিডার’ হিসেবে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে, সেখানে জিপিএইচ ইস্পাত তাদের উইনলিংক ও কোয়ান্টাম ফার্নেসের নিখুঁত কেমিক্যাল কন্ট্রোল প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশে প্রথম ও এককভাবে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন ৬০০-গ্রেডের রড বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করছে, যা কারখানায় সম্পূর্ণ ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’ ডিজিটাল অটোমেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।

তবে কারখানায় এত সেরা ও রোবোটিক প্রযুক্তির ছোঁয়া থাকার পরও দেশের বাজারে জিপিএইচ ব্র্যান্ডের রডের চাহিদা কমে যাচ্ছে। বিষয়টি ঢাকা স্ট্রিট জার্নালের কাছে স্বীকারও করেন জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. মোশারফ হোসেন। তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আমাদের এই ব্যবসায়িক মন্দার জন্য বহুলাংশে দায়ী। বিশেষ করে সরকারি বড় বড় মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা, বেসরকারি খাতের নতুন আবাসন ও শিল্প বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বাজারে রডের চাহিদায় বড় ধরনের পতন ঘটেছে।

এদিকে বিক্রি কমে যাওয়ায় কাঁধে থাকা বিশাল ব্যাংক ঋণের বিপরীতে সুদ ও অর্থায়ন ব্যয় জিপিএইচ ইস্পাতের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য নয় মাসে কোম্পানিটির সুদ ব্যয় বা ফাইন্যান্স কস্ট হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪০০ কোটি টাকা। বর্তমান উচ্চ সুদের হার এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নজনিত কারণে ঋণ ব্যবস্থাপনা ব্যয় তীব্র চাপ তৈরি করছে। শুধু চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই সুদের পেছনে এই বিপুল পরিমাণ টাকা চলে যাওয়ায় কোম্পানিটি ১০ কোটি টাকারও বেশি নিট লোকসান করেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে কোম্পানিটির ৩০ কোটি টাকারও বেশি নিট মুনাফা ছিল।

আর্থিক অবস্থার বিবরণী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জিপিএইচ ইস্পাতের ঋণের বোঝা এখন আকাশচুম্বী। চলতি বছরের ৩১ মার্চ শেষে কোম্পানির মোট দায় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৩ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা ও স্বল্পমেয়াদি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। তবে বিশাল এই ঋণের বিপরীতে কোম্পানির সুদ ব্যয় কমিয়ে দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জিপিএইচ ইস্পাতের বিপুল ঋণ ও এর বিপরীতে সুদ কিছুটা কম দেখানোর কারণ প্রসঙ্গে কোম্পানি সচিব মোশারফ হোসেন বলেন, আমাদের কিছু বড় ঋণ ব্যাংকের সাথে আলোচনার মাধ্যমে পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং কিছু ঋণকে স্বল্পমেয়াদি থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করা হয়েছে, যার কারণে সাময়িকভাবে আমাদের সুদের নগদ ব্যয় কিছুটা কম দেখাচ্ছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top