বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও ব্যবহারের ধরনে প্রকট বৈষম্য এবং কারিগরি দক্ষতার নিদারুণ অভাব দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫৩.৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবহারের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩২.১ শতাংশে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের ৮৪.৪ শতাংশ ব্যবহারকারীর ডিজিটাল দক্ষতা কেবল ‘কপি-পেস্ট’ করার মতো প্রাথমিক পর্যায়ের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস কার্যালয়ে ‘আইসিটি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ ২০২৪-২৫’ শীর্ষক প্রকল্পের জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এই প্রথমবারের মতো বিবিএস জেলাভিত্তিক আইসিটি তথ্য প্রকাশ করল, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ডিজিটাল বিভাজনকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
স্মার্টফোনে শীর্ষে ফেনী, তলানিতে পঞ্চগড়
পরিবারভিত্তিক স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করেছে ফেনী। জেলাভিত্তিক এই উপাত্তে দেখা যায়, শীর্ষ ১০টি জেলার মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, চাঁদপুর ও শরীয়তপুর। অন্যদিকে, স্মার্টফোন ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে উত্তরের জেলাগুলো। তালিকার তলানিতে থাকা ১০টি জেলার মধ্যে রয়েছে কুড়িগ্রাম, ঝালকাঠি, শেরপুর, নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, গাইবান্ধা এবং সবার শেষে পঞ্চগড়।
শহর-গ্রাম ব্যবধান ও উচ্চমূল্যের বাধা
জরিপে দেখা যায়, শহর এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৭৫.৭ শতাংশ হলেও গ্রামাঞ্চলে তা মাত্র ৪৩.৬ শতাংশ। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য এই বৈষম্যের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৩.৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, অতিরিক্ত দামের কারণে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে অনাগ্রহী। মূলত সাশ্রয়ী ডেটা প্যাকেজের অভাবই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষতার চিত্র: কপি-পেস্টই ভরসা
প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহারের সক্ষমতা পরিমাপে দেখা গেছে, সিংহভাগ মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত প্রাথমিক স্তরের। ৮৪.৪ শতাংশ ব্যবহারকারী কেবল তথ্য অনুলিপি বা কপি-পেস্ট করতে পারেন। জটিল কারিগরি কাজ বা পেশাদার সফটওয়্যার ব্যবহারের দক্ষতা এখনো অর্জিত হয়নি। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে কম্পিউটারের সীমিত ব্যবহারকে; সারা দেশে কম্পিউটার ব্যবহারের হার মাত্র ১১.৩ শতাংশ। কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে থাকলেও সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ঠাকুরগাঁও।
মোবাইল ব্যবহার ও ইন্টারনেটের উদ্দেশ্য
দেশের মোট জনসংখ্যার ৮৮.৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, তবে নিজস্ব ডিভাইস রয়েছে ৬৪.৪ শতাংশের। গত তিন মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যবহারকারীদের ৬৪.৪ শতাংশই ইন্টারনেটে সরকারি চাকরির তথ্য খুঁজেছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খেলাধুলা সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধান (৪৯.৮%)। তবে ই-কমার্স বা অনলাইন কেনাকাটার হার এখনো অনেক কম, মাত্র ১১.৬ শতাংশ ব্যবহারকারী এই সুবিধা নিয়েছেন।
সাইবার নিরাপত্তা ও ঝুঁকি
নিরাপত্তা সচেতনতার ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। ৭৮.৫ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে তারা সাইবার আক্রমণের শিকার হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। তবে নিয়মিত ঝুঁকির মধ্যে ৫০.৫ শতাংশই ভাইরাস ও ম্যালওয়্যার সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন।
বিবিএস-এর এই জরিপ প্রতিবেদনটি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার পথে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে। একদিকে যেমন ভৌগোলিক বৈষম্য (শহর বনাম গ্রাম এবং পূর্ব বনাম উত্তরবঙ্গ) প্রকট, অন্যদিকে ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য ও উৎপাদনশীল কাজে দক্ষতার অভাব ডিজিটাল বিপ্লবের সুফলকে সীমিত করে রাখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অবকাঠামো নয়, বরং প্রান্তিক পর্যায়ে সাশ্রয়ী ইন্টারনেট ও গুণগত কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন বড় কাজ।













