জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মাত্র ৩০০ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ৬১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। কিন্তু প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পুরো ব্যয়ের মাত্র ১৩ শতাংশ সরাসরি যাবে সুবিধাভোগীদের কাছে। বিপরীতে প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক অর্থ ব্যয় হবে দেশি-বিদেশি ৪৭৩ জন পরামর্শকের পেছনে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড এর শতভাগ অনুদানে বাস্তবায়নযোগ্য ‘ইন্টিগ্রেট’ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সুবিধাভোগীদের সরাসরি অনুদানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। অন্যদিকে পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৪৮.৩৩ শতাংশ।
অর্থাৎ, যাদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে, তাদের জন্য বরাদ্দ অর্থের প্রায় চার গুণ ব্যয় হবে শুধু পরামর্শক খাতে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত প্রকল্পের টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রস্তাব (টিএপিপি) বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। আগামী ৫ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
প্রকল্পের লক্ষ্য হলো সাতক্ষীরা, খুলনা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জ জেলার জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত ২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ মোট ৩০০ জনকে সমবায়ভিত্তিক আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা। এ ছাড়া আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা।
সুবিধাভোগীর চেয়ে বড় প্রশাসনিক কাঠামো
টিএপিপির ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু পরামর্শক ব্যয়ই নয়, প্রকল্প পরিচালনা ও প্রশাসনিক খাতেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১৬.৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ, পরামর্শক ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় মিলিয়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা পুরো প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
সংখ্যার দিক থেকেও বিষয়টি ব্যতিক্রমী। মাত্র ৩০০ জন প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীর জন্য দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৪৭৩ জন পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পে সুবিধাভোগীর সংখ্যার চেয়েও পরামর্শকের সংখ্যা দেড় গুণেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু যখন পরামর্শক ও প্রশাসনিক ব্যয় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যায়, তখন ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশীদ বলেন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে পরিচালিত অনেক প্রকল্পেই অনুদানের বড় অংশ বিভিন্ন পরামর্শক, কারিগরি সহায়তা ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের মাধ্যমে আবার দাতা সংস্থার দেশেই ফিরে যায়।
তার ভাষায়, “মাত্র ৩০০ মানুষের জন্য প্রায় ৫০০ পরামর্শক কতটা প্রয়োজন, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য যদি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন হয়, তাহলে অর্থের বড় অংশ সরাসরি সুবিধাভোগীদের কাছেই পৌঁছানো উচিত।”
তিনি বলেন, দেশীয় কিছু বিশেষজ্ঞ সুযোগ পেলেও আন্তর্জাতিক পরামর্শক ব্যয়ের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই ফিরে যায়। ফলে অনুদানের ঘোষিত অঙ্ক বড় হলেও স্থানীয় অর্থনীতিতে তার প্রকৃত প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে।
বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণেও কোটি টাকার বরাদ্দ
প্রকল্পটিতে বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ ও অফিস পরিচালনার জন্যও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। টিএপিপি অনুযায়ী, বিদেশ ভ্রমণের জন্য থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য আরও ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং অফিস ভাড়ার জন্য ৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
কিন্তু কতজন কর্মকর্তা বিদেশে যাবেন, কোন দেশে যাবেন, সফরের মেয়াদ কত হবে কিংবা কী ধরনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন—এসব বিষয়ে প্রকল্প নথিতে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণে কড়াকড়ি বহাল রয়েছে। সেই বাস্তবতায় নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া এত বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একইভাবে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য পৃথক বরাদ্দ থাকলেও এসব ব্যয়ের বিপরীতে কী ধরনের পরিমাপযোগ্য ফলাফল অর্জিত হবে, তার সুস্পষ্ট কর্মসম্পাদন সূচকও টিএপিপিতে উল্লেখ নেই।
প্রকল্পের অঙ্কের বাস্তব চিত্র আরও বিস্ময়কর। বর্তমান বরাদ্দ অনুযায়ী প্রতিজন সুবিধাভোগীর জন্য রাখা হয়েছে গড়ে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অথচ একই ৬১ কোটি টাকা সরাসরি ৩০০ জনের মধ্যে বণ্টন করা হলে প্রত্যেকে পেতেন ২০ লাখ টাকারও বেশি। অর্থাৎ প্রকল্পে মানুষের হাতে পৌঁছানোর চেয়ে পরামর্শক, প্রকল্প পরিচালনা ও প্রশাসনিক ব্যয়ই বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছে।
মামুন আল রশীদের মতে, “৬১ কোটি টাকার প্রকল্পে যদি প্রায় ৫৩ কোটিই পরামর্শক, ব্যবস্থাপনা, অফিস পরিচালনা ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা কতটা উপকৃত হবেন, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।”
তার মতে, এই ধরনের প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয়ের একটি অংশও যদি সরাসরি সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হতো, তাহলে বাস্তব সামাজিক প্রভাব আরও দৃশ্যমান হতে পারত।
তিনি আরও বলেন, “উন্নয়ন সহযোগীরা ১০ টাকা অনুদান দিয়ে যদি ৭ টাকা বিভিন্ন খাতে আবার নিজেদের কাছেই ফিরিয়ে নেয়, তাহলে সেটিকে নিঃস্বার্থ উন্নয়ন সহযোগিতা বলা কঠিন। বাংলাদেশকেও এ ধরনের প্রকল্পে ব্যয়ের কাঠামো নিয়ে আরও কঠোর দরকষাকষি করতে হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে যখন প্রকল্পের বড় অংশ প্রশাসনিক ব্যয়, পরামর্শক এবং বিদেশ সফরে চলে যায়, আর প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ নেমে আসে মোট ব্যয়ের মাত্র ১৩ শতাংশে, তখন প্রকল্পের ব্যয়দক্ষতা ও জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এখন নজর পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকের দিকে। সেখানে ব্যয়ের এই কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে, নাকি পরামর্শক ও প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে সরাসরি সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর সুপারিশ আসবে—সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য বাস্তব পরিবর্তন আনবে, নাকি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়েই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকবে।













