আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাগজনির্ভর প্রক্রিয়া থেকে ডিজিটাল লেনদেনে রূপান্তরের পথে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনুমোদিত ট্রেড করিডরের মাধ্যমে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) ও ডকুমেন্টারি কালেকশনের আওতায় বাণিজ্যিক নথি সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিনিময় ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য একটি নতুন পাইলট কাঠামো ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এর মাধ্যমে সীমান্তপারের বাণিজ্যে গতি, স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং কার্যদক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত ৬ জানুয়ারি জারি করা এফই সার্কুলার নং-০১-এর ধারাবাহিকতায় নতুন এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারেবল রেকর্ডস (ইটিআর) ব্যবহারের মাধ্যমে বাণিজ্যিক নথির ডিজিটাল রূপকে কার্যকর ও আইনগত স্বীকৃতির আওতায় আনা।
নতুন কাঠামোর আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে কয়েকটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করতে হবে। ব্যবহৃত প্রযুক্তি এমন হতে হবে, যা কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম বা সেবা প্রদানকারীর ওপর নির্ভরশীল নয় এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং ক্রিপ্টোগ্রাফির মাধ্যমে নথির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় বাণিজ্যিক তথ্যের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছেই থাকবে। কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে বাধ্যতামূলকভাবে সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, আইনগত ও পরিচালনাগত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এসব ইলেকট্রনিক ট্রেড ডকুমেন্ট কাগজভিত্তিক মূল নথির সমান আইনগত মর্যাদা পাবে।
এই পাইলট কর্মসূচিতে অংশ নিতে আগ্রহী অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে হবে। আবেদনে সংশ্লিষ্ট ট্রেড করিডর, বিদেশি অংশীদার ব্যাংক, লেনদেনের ধরন, ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত পরিকল্পনা উল্লেখ করতে হবে।
নতুন ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক চালান, পরিবহনসংক্রান্ত নথি—যেমন ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিং—এবং বিল অব এক্সচেঞ্জ বা ড্রাফট ডিজিটালভাবে প্রক্রিয়াকরণ করা যাবে। তবে প্রতিটি ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারেবল রেকর্ডের একটি মাত্র মূল সংস্করণ থাকবে এবং অননুমোদিত পরিবর্তন প্রতিরোধে ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট (হ্যাশ) প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্ভব না হলে কাগজভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা যাবে।
আমদানি ও রপ্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই এই ডিজিটাল নথি ব্যবহার করা যাবে। আমদানির ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকের সম্মতি সাপেক্ষে ইলেকট্রনিক নথি গ্রহণযোগ্য হবে। যেসব দেশে ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারেবল রেকর্ড এখনো আইনগত স্বীকৃতি পায়নি, সেখানে প্রাথমিক যাচাইয়ের জন্য ডিজিটাল কপি ব্যবহার করা গেলেও পরবর্তী সময়ে মূল কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
রপ্তানির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকেরা সরাসরি ইলেকট্রনিক নথি জমা দিতে পারবেন এবং ব্যাংকগুলো নিরাপদ ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে তা বিদেশি ব্যাংকে প্রেরণ করবে। ডিজিটাল স্বাক্ষর, নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম অথবা অনুমোদিত আন্তঃব্যাংক বার্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে নথির নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদন হস্তান্তর করা যাবে। পুরো প্রক্রিয়ার অডিট ট্রেইল ও ডিজিটাল লগ ভবিষ্যৎ যাচাইয়ের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তার বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোকে এনক্রিপশন, ব্যবহারকারী পরিচয় যাচাই, টাইম-স্ট্যাম্প এবং আন্তর্জাতিক তথ্যনিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এমন প্রযুক্তি বা সেবা প্রদানকারী নির্বাচন করতে হবে, যাতে কোনো একক ভেন্ডরের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি না হয় এবং প্রয়োজনে একাধিক প্ল্যাটফর্মে সমানভাবে কাজ করা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পাইলট কর্মসূচির বাস্তবায়ন পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা হবে। অভিজ্ঞতা ও ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই পাইলট কাঠামোর বাইরে থাকা অন্যান্য বৈদেশিক বাণিজ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে ৬ জানুয়ারি ২০২৬-এর এফই সার্কুলার নং-০১ এবং বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রাবিষয়ক বিধিমালা আগের মতোই কার্যকর থাকবে।













