দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল আর্থিক অবস্থা এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের ভারে বিপর্যস্ত চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের জন্য শেষ সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ধারা ১৫ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণের জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্তগুলো পূরণে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি রেজল্যুশন কার্যক্রম, অর্থাৎ অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ সুবিধা পাওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান হলো—প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) লিমিটেড এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড। গত বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক পৃথক চিঠির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ অনাদায়ের কারণে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যত অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। তবে নতুন আইনের আওতায় সরাসরি অবসায়নে না গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি শেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী, তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও স্পনসর শেয়ারধারীদের উদ্যোগে নতুন মূলধন সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় তারল্য জোগান দিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
এ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় সম্পদ বিক্রি, বকেয়া ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি, খেলাপি ঋণের হার গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং সাধারণ ও ব্যক্তিগত আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান এসব শর্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে রেজল্যুশন কার্যক্রম শুরু করা হবে। সে ক্ষেত্রে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ, সম্পদ বিক্রি অথবা অবসায়নসহ আইনে বর্ণিত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য চারটি প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগে অগ্রগতি-সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চারটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাই অত্যন্ত নাজুক। বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)-এর খেলাপি ঋণের হার ৯৭.৩০ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত লোকসানের পরিমাণ ৪৮০ কোটি টাকা।
প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৮৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত লোকসান ৯৪১ কোটি টাকা। জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত লোকসান ৩৩৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৩৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৮ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত লোকসান ৩৫১ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের আওতায় এটি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মূলধন জোগান, তারল্য ব্যবস্থাপনা, ঋণ আদায় এবং আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে না পারে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো নতুন আইনের অধীনে অবসায়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পথে এগোবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা আর্থিক খাতের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।













