নানামুখী অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তা পর্যায়ে চরম চাহিদা মন্দার কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই (জুলাই-এপ্রিল) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে এনবিআরের ওপর রাজস্ব আদায়ের যে বিশাল বোঝা চেপেছে, তা বর্তমান সংকুচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন অর্থনীতির পর্যবেক্ষকেরা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকারের বাজেট ও উন্নয়ন ব্যয় সচল রাখতে হলে শেষ দুই মাসে (মে ও জুন) এনবিআরকে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭১ কোটি টাকার এক বিশাল ও অসম্ভব অঙ্কের রাজস্ব আহরণ করতে হবে। বুধবার (২০ মে) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন এবং পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে মোট ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। এর মধ্যে প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। তবে আয়কর, মূসক ও শুল্ক মিলিয়ে এই ১০ মাসে সংস্থাটির মোট প্রকৃত আহরণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকায়, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৪.২২ শতাংশ কম।
এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূলত কাস্টমস খাতে আমদানি শুল্ক এবং ভ্যাট খাতে স্থানীয় পর্যায়ের সম্পূরক শুল্ক বাবদ রাজস্ব আহরণ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হওয়ার কারণেই এপ্রিলে এসে ঘাটতির পরিমাণ আরো বড় হয়েছে।
অর্থনীতির পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যমতে, বেসরকারি খাতে ঋণ ও পুঁজির সঞ্চালন কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানির মাধ্যমে এনবিআর সবচেয়ে বেশি রাজস্ব পেয়ে থাকে, সেগুলোর আমদানি এখন তলানিতে ঠেকেছে। এর ফলে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আমদানি শুল্ক বাবদ রাজস্ব আহরণে ৮.৯২ শতাংশের বড় সংকোচন বা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত অর্থবছরের ১০ মাসে যেখানে এ খাতে ৩১ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা এসেছিল, এবার তা কমে ২৯ হাজার ৯৩ কোটি টাকায় নেমেছে।
শুধু একক মাস হিসেবে এপ্রিলের পরিসংখ্যান আরও আশঙ্কাজনক। এপ্রিলে মোট ৪৫ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এনবিআর আদায় করতে পেরেছে ৩৯ হাজার ৬০ কোটি টাকা। গত বছরের এপ্রিলে স্থানীয় পর্যায়ের সম্পূরক শুল্ক থেকে যেখানে ৮ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা এসেছিল, এবার তা ১৩.১৮ শতাংশ কমে ৭ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া এপ্রিলে মূসক বা ভ্যাট খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.১৭ শতাংশ। ১০ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। আর আয়কর খাতে ১৪ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ১০ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা।
তবে লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও গত অর্থবছরের তুলনায় মাসভিত্তিক ও বছরভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ধারা কিছুটা বজায় রয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ২ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছিল, সেই তুলনায় এবার ১০.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এছাড়া শুল্ক, মূসক ও আয়কর খাতে ১০ মাসে যথাক্রমে ৮.৮৭ শতাংশ, ১১.১ শতাংশ এবং ১১.৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি সংশোধিত বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। উদ্যোক্তারা উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ব্যবসা পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের কোষাগারে।













