পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিদেশে রোডশো আয়োজনের চেয়ে ভালো ও বড় কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করাকেই বেশি কার্যকর বলে মনে করেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেছেন, ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম রোধে নিয়মিত অডিট চালানো হবে এবং বর্তমানে বিএসইসির ওপর কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ নেই।
শনিবার (১৮ জুলাই) রাজধানীর এফডিসিতে ‘পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, অতীতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে বিভিন্ন দেশে রোডশো আয়োজন করা হলেও এর বাস্তব সুফল খুব বেশি পাওয়া যায়নি। বরং বাজারে মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে পারলে দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীর আস্থা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। তাঁর মতে, অপ্রয়োজনীয় রোডশোর মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তিনি জানান, বর্তমানে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম চলছে। এর অংশ হিসেবে নিয়মিত অডিটের ব্যবস্থা করা হবে। এতে অনিয়ম, কারসাজি ও দুর্বল তদারকির সুযোগ কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত হবে।
মাসুদ খান বলেন, বর্তমান কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করছে এবং বিএসইসির ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই। তিনি জানান, সরকারও কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বিএসইসির স্বাধীন কার্যক্রমের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন। ফলে নীতিনির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করতে দেশের খ্যাতনামা বহুজাতিক কোম্পানি এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) সুযোগ দেওয়া হবে। এতে দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে উৎসাহিত হবে। এর মাধ্যমে বাজারের গুণগত মান যেমন বাড়বে, তেমনি বিনিয়োগকারীদের জন্যও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আগের সরকারের সময়ে একীভূত করা পাঁচটি ব্যাংক এবং কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদের তুলনায় দায় অনেক বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, গত দেড় দশকে কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে দেশের পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারিয়েছে। তাঁর দাবি, গত ১৫ বছরে কারসাজি ও জালিয়াতির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে ধারাবাহিক লোকসানের কারণে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ বিনিয়োগকারী বাজার থেকে সরে গেছেন এবং বহু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে সুশাসন, কঠোর নজরদারি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ধারাবাহিকতার ওপর।
ছায়া সংসদ প্রতিযোগিতায় ‘দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণেই পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে’ শীর্ষক প্রস্তাবের পক্ষে অংশ নিয়ে প্রাইম ইউনিভার্সিটির বিতার্কিকরা বিজয়ী হন। তারা সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির দলকে পরাজিত করেন।













