রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন আগামি এডিপিতে

DSJ Web Photo May 9 2026 ADP2026
ডিএসজে কোলাজ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) তারই প্রতিফলন ঘটেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নজিরবিহীন বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় চূড়ান্ত হওয়া এই এডিপি আগামী ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে, যেখানে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এডিপির আকার বাড়ছে ৩০ শতাংশেরও বেশি।

বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দর্শনে ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন’ এবং ‘মানবিক রাষ্ট্র’ গঠনের যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে খাতভিত্তিক বরাদ্দে। অতীতে ভৌত অবকাঠামো বা মেগা প্রজেক্টে বরাদ্দের হিড়িক থাকলেও এবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকারের তালিকায় ওপরের দিকে রাখা হয়েছে।

খাতভিত্তিক বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগামী এডিপিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে শিক্ষা খাত। এ খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি ১২ লাখ টাকা বা মোট বরাদ্দের ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৫০ হাজার ৯২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এই বিপুল বরাদ্দের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত সরকারের সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অংশ যেখানে বলা হয়েছিল, জিডিপির একটি বড় অংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হবে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক শীর্ষ বরাদ্দপ্রাপ্ত তালিকায় রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের প্রস্তুত করা কার্যপত্র অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির মোট আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের এডিপির চেয়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ৩০.৪৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বা জিওবি অংশ ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৩.৩৩ শতাংশ। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নের ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা যুক্ত হলে সামগ্রিক উন্নয়ন বাজেটের আকার দাঁড়াবে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকার বেশি।

বড় আকারের এই উন্নয়ন বাজেটকে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছে সরকার। কার্যপত্রে বলা হয়েছে, নতুন এডিপি প্রণয়নে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু সহিষ্ণু উন্নয়ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতি মোকাবিলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিন অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট এবং ডেল্টা প্ল্যান সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৪৯টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৭টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প ৪৩টি। এছাড়া ১ হাজার ২৭৭টি অননুমোদিত নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির জন্যও আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রোগ্রামিং কমিটি সুপারিশ করেছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ১ হাজার ৬০টি বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভর। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি ভিত্তিক ৮০টি প্রকল্পও নতুন এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ। বাস্তবায়নের এই ধীরগতির মধ্যেই আগামী অর্থবছরের জন্য বড় আকারের এডিপি প্রস্তাব করায় প্রকল্পের গুণগত মান ও সময়মতো শেষ করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদরা। তা সত্ত্বেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে একটি ইতিবাচক ‘পলিটিক্যাল শিফট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এনইসি সভায় অনুমোদনের পরই চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই উন্নয়ন বাজেট।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top