লুটেরাদের ফেরার আতঙ্কে ব্যাংক মালিকরা

DSJ Web Photo May 11 2026 BB
ছবি: বাংলাদেশ ব্যাংক

ব্যাংক রেজোলিউশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় দেশের ব্যাংকিং খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই ধারার ফাঁক গলে অতীতের ‘ব্যাংক লুটেরা’ ও দখলদাররা পুনরায় মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ পেতে পারেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইনের কঠোর শর্তাবলির কারণে কোনো অনিয়মকারীর পক্ষেই পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফেরা সম্ভব নয়।

সোমবার (১১ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিএবি নেতাদের সঙ্গে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের এক উচ্চপর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিএবি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি ও ব্যাংক উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এ. কে. আজাদ, পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান, বিএবির ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউসিবি’র চেয়ারম্যান শরীফ জহির এবং ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান রোমো রউফ চৌধুরীসহ অন্য নেতৃবৃন্দ।

বৈঠক সূত্র জানায়, ব্যাংক রেজোলিউশন আইনের ১৮(ক) ধারাটি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়িক মহলে নেতিবাচক গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, এই বিশেষ ধারার অপব্যাখ্যা বা সুযোগ নিয়ে অতীতে ব্যাংক দখল, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের সাথে জড়িত একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী আবারও ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিএবি নেতারা বিষয়টিকে ব্যাংকিং খাতের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “যারা পরিকল্পিতভাবে ব্যাংক লুট করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করেছে, তারা যদি কোনো আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পুনরায় পরিচালনা পর্ষদে ফিরে আসে, তবে তা হবে পুরো খাতের জন্য আত্মঘাতী। আমরা গভর্নরকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছি যে, এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে আমানতকারীদের আস্থা সম্পূর্ণ ধসে পড়বে।”

বিএবি নেতাদের এই উদ্বেগের জবাবে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান তাদের আশ্বস্ত করেন। তিনি জানান, রেজোলিউশন আইনে এমন কিছু সংস্থান ও কঠোর ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ ক্রাইটেরিয়া রাখা হয়েছে, যা অনিয়মকারীদের জন্য অভেদ্য দেওয়াল হিসেবে কাজ করবে। শর্তগুলো এতটাই জটিল যে, কোনো লুটপাটকারীর পক্ষে সেগুলো পূরণ করে পুনরায় পরিচালক হওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে ব্যাংক খাতকে নতুন করে অস্থির করার কোনো সুযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেবে না।

বৈঠকে আলোচিত অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়া। বিএবি চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার জানান, ইতোমধ্যে যেসব ব্যাংকের মার্জার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো অবকাশ নেই বলে গভর্নর সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। তবে ভবিষ্যতে অন্য কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে বিএবি যে পরামর্শ দিয়েছে, তাতে গভর্নর নীতিগত একমত পোষণ করেছেন।

শিল্প ও অর্থনীতির চাকা সচল করতে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালু করার বিষয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আব্দুল হাই সরকার জানান, প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে সম্ভাবনাময় কারখানাগুলোকে ব্যাংকগুলো চলতি মূলধন (Working Capital) সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে কেন একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলো এবং এর উদ্যোক্তার অতীত রেকর্ড কী—তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেই কেবল অর্থায়ন করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোকে পুনরায় চালুর লক্ষ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ রিফাইনান্স তহবিল গঠনের কাজ চলছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, এই সুবিধা ঢালাওভাবে সবাই পাবে না। শুধুমাত্র যাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা রয়েছে এবং হাতে বিদেশি ক্রয়াদেশ (অর্ডার) আছে, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রকৃত উদ্যোক্তা বাছাইয়ের মাধ্যমে এই তহবিল ব্যবহারের ফলে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সংস্থান হবে বলে আশা করছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top