বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় অর্থপাচার ও সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হিসেবে আবারও উঠে এসেছে ব্যাংক খাত। কঠোর নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আর্থিক খাতে বাড়তি অনুসন্ধানের ফলে গত পাঁচ বছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন প্রায় ছয়গুণ বেড়েছে।
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) জমা পড়েছে ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন, যার ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংক খাত থেকে।
একই সময়ে শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যসহ অন্তত ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও রিপোর্টিং বাড়ার ফলেই এসব সম্পদের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষমতার পরিবর্তনের আগে ও পরে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল জবাবদিহিই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে বিএফআইইউর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন সংস্থাটির প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (STR) এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি ছিল সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন (SAR)। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩৪৫টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১২ হাজার ৮৫৪টি বা প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি প্রতিবেদন জমা হয়েছে।
আরও দীর্ঘমেয়াদি চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে মাত্র ৫ হাজার ২৮০টি সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন জমা পড়েছিল, চার বছর পর সেই সংখ্যা বেড়ে ৩০ হাজার ১৯৯টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে রিপোর্টিং প্রায় ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংক খাতেই ৯৫ শতাংশ রিপোর্ট
বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি প্রতিবেদনের মধ্যে ২৮ হাজার ৭৫৫টিই এসেছে ব্যাংক খাত থেকে, যা মোট প্রতিবেদনের প্রায় ৯৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর জমা দেওয়া প্রতিবেদন ছিল ১৫ হাজার ৯৯১টি। এক বছরে এ সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট প্রতিবেদনের ৯১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংক থেকে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদন ১২১টি থেকে বেড়ে ২৫০টিতে এবং অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন ৯০০টি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৫টিতে উন্নীত হলেও মোট প্রতিবেদনে তাদের অংশ যথাক্রমে প্রায় ১ শতাংশ ও ৪ শতাংশ।
বিএফআইইউর মতে, ব্যাংক খাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, উন্নত মনিটরিং ব্যবস্থা এবং আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ায় রিপোর্টিং উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জব্দ ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ
সংবাদ সম্মেলনে বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান, শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্য এবং ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যৌথ তদন্তের আওতায় দেশে ও বিদেশে মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে থাকা সম্পদের মূল্য প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশে জব্দ হওয়া সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
তিনি বলেন, চুরি হয়ে যাওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে। বছরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির আশা করছেন তারা।
যেসব শিল্পগোষ্ঠী তদন্তের আওতায় রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—এস আলম, বেক্সিমকো, নাবিল, সামিট, ওরিয়ন, নাসা, বসুন্ধরা, ডা. ইকবালের প্রিমিয়ার গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের আরামিট গ্রুপ।
“কাউকে টার্গেট করে হিসাব জব্দ করি না”
বিএফআইইউ প্রধান বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় দেখে ব্যবস্থা নিই না। সন্দেহজনক কার্যক্রমের আইনগত ভিত্তি পাওয়া গেলেই ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কারও বিরুদ্ধেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেলে একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তার ভাষ্য, আগে অনেক ব্যাংক সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাঠাতে ভয় পেত। এখন সেই ভয় কমেছে বলেই রিপোর্টিং বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সন্দেহজনক লেনদেনের অধিকাংশ ব্যাংক থেকে আসায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, দায়ী ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ব্যাংকগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছি—সন্দেহজনক লেনদেনে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
মানারাত ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এবং সরকার পরিবর্তনের পর অর্থপাচারের চেষ্টা বেড়ে যাওয়ার প্রতিফলনই এখন রিপোর্টিংয়ে দেখা যাচ্ছে।
তার মতে, অধিকাংশ অর্থ আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বিদেশে পাচার হয় এবং এ প্রক্রিয়ায় অনেক সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা কিংবা অভ্যন্তরীণ সহযোগিতাও কাজ করে।
তিনি বলেন, “শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জবাবদিহি ও নৈতিক মূল্যবোধ জোরদার না করলে অর্থপাচার বন্ধ করা কঠিন হবে।”
বিএফআইইউ জানিয়েছে, অনলাইন জুয়া, ক্রিপ্টোকারেন্সি, বৈদেশিক মুদ্রার অবৈধ লেনদেন এবং ডিজিটাল হুন্ডিকে এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের ওপর বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তের সক্ষমতাও জোরদার করা হয়েছে।













