বন্ধ শিল্পে ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

ডিএসজে

বিগত কয়েক বছরের মন্থর অর্থনৈতিক গতিকে চাঙ্গা করতে এবং ঝিমিয়ে পড়া বেসরকারি খাতকে টেনে তুলতে এক নজিরবিহীন নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া সম্ভাবনাময় শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মন্থর অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং একটি শক্তিশালী বিনিয়োগনির্ভর টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠিত এই তহবিলের আওতায় একক কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মোটা অঙ্কের চলতি মূলধন ঋণ সুবিধা পাবে।

“বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম” নামে গঠিত এই বিশাল তহবিলের আওতায় আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ, কিন্তু সঠিক আর্থিক সহায়তায় পুনরায় সচল করা সম্ভব—এমন সব শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের এই আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই তহবিলের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে দেশের রপ্তানিমুখী খাতগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এই ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিলটি গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাত্র ৪ শতাংশ সুদে এই অর্থ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রাক-অর্থায়ন হিসেবে দেবে এবং ব্যাংকগুলো কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য ও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ হিসেবে বিতরণ করবে।

প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১ বছর, তবে শর্ত হচ্ছে—প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ও উৎপাদনমুখী থাকলে তা পরবর্তী সময়ে নবায়ন করা যাবে। এই স্কিমের আওতায় গ্রাহক বা শিল্পমালিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। এছাড়া ঋণের অর্থ ছাড়ের পর প্রথম মাস ‘গ্রেস পিরিয়ড’ হিসেবে গণ্য হবে, অর্থাৎ এই সময়ে কোনো কিস্তি দিতে হবে না।

ঋণ পাওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ প্রতিষ্ঠান, কিংবা বর্তমানে সচল থাকলেও স্রেফ চলতি মূলধনের অভাবে পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না—এমন প্রতিষ্ঠানগুলো এই ২০০ কোটি টাকার সুবিধা পাবে। এছাড়া কোনো বন্ধ শিল্পের যদি দক্ষ ব্যবস্থাপনা থাকে কিংবা অন্য কোনো সক্ষম প্রতিষ্ঠান যদি কোনো বন্ধ শিল্পকে আইনগতভাবে অধিগ্রহণ করে তা চালু করার উদ্যোগ নেয়, তবে তারাও এই বিশেষ প্রাক-অর্থায়নের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

তবে ঋণ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ওই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, বন্ধ হওয়ার প্রকৃত কারণ, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং ঋণ পরিশোধের বাস্তব সক্ষমতা বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোকে বিশেষজ্ঞ বা থার্ড পার্টি নিয়োগ করে বিশেষ টেকনিক্যাল রিপোর্ট প্রস্তুত করতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা, অর্থপাচার বা কোনো ধরনের আর্থিক জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই এই স্কিমের আওতায় ঋণ পাবে না। এই বিশেষ তহবিলের অর্থ কোন কোন খাতে ব্যবহার করা যাবে তাও সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত ঋণের অর্থ সরাসরি শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া ও নিয়মিত বেতন-ভাতা, কারখানার বিদ্যুৎ-গ্যাস ও পানি বিল পরিশোধ, কাঁচামাল সংগ্রহ, দৈনিক উৎপাদন ব্যয় এবং জরুরি রপ্তানি অর্ডার বাস্তবায়নের মতো উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা যাবে। তবে শ্রমিকদের বেতন বাবদ সর্বোচ্চ চার মাসের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া যাবে এবং তা চটের বস্তা বা ক্যাশে নয়, সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে; কোনো অবস্থাতেই কোনো নগদ বা ক্যাশ লেনদেন করা যাবে না। ঋণের সঠিক ও শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা ব্যাংক ওই শিল্প প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে নিজেদের প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক নিয়োগ করতে পারবে।

বাংলাদেশে কার্যরত সব তফসিলি ব্যাংক এই স্কিমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-৩’-এর সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। ৩ বছর মেয়াদি এই স্কিমটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে সরাসরি পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে।

এই স্কিমের ঋণের সমস্ত ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর বর্তাবে এবং গ্রাহক পর্যায় থেকে ঋণ আদায়ের শতভাগ দায়ও ব্যাংকের নিজের। প্রচলিত ব্যাংকের পাশাপাশি দেশের ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোও তাদের নিজস্ব শরিয়াহ অনুমোদিত বিনিয়োগ পদ্ধতিতে এই স্কিম বাস্তবায়ন করতে পারবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top