সরকারি ব্যয়ে লাগাম টানতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি কার্যকর করেছে সরকার। নতুন পরিপত্র অনুযায়ী সরকারি অর্থে নতুন গাড়ি কেনা, নতুন ভবন নির্মাণ, থোক বরাদ্দ থেকে ব্যয় এবং অধিকাংশ বিদেশ সফরের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের বিভিন্ন ব্যয় স্থগিত ও সীমিত করার লক্ষ্যে একটি জরুরি পরিপত্র জারি করে। অর্থ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনা দেশের সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, সরকারি করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে।
এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সূত্র থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব নয় এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন ধীরগতির হওয়ায় অতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধনের প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কঠোর ব্যয়সংযমের পথেই হাঁটল সরকার।
পরিপত্র অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে পরিচালন বাজেটের আওতায় সব ধরনের থোক বরাদ্দ থেকে ব্যয় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনার জন্য বরাদ্দ করা অর্থও আপাতত ব্যয় করা যাবে না।
তবে দুটি ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ছাড় রাখা হয়েছে। ১০ বছরের বেশি পুরোনো অনুমোদিত সরকারি যান প্রতিস্থাপন এবং নতুন গঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নিয়ে যানবাহন কেনা যাবে। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত যান ছাড়া অন্য সব নতুন জিপ ও কার হতে হবে পূর্ণ বৈদ্যুতিকচালিত।
সরকারি ভবন নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। পরিচালন বাজেটের আওতায় নতুন আবাসিক, অনাবাসিক কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। তবে কোনো নির্মাণকাজের অন্তত ৭০ শতাংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে থাকলে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা যাবে।
এ ছাড়া পরিচালন বাজেটের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় বন্ধ থাকবে। সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম বা ঋণ সুবিধাও স্থগিত করা হয়েছে।
উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রেও নতুন মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তবে পরিপত্র জারির আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাতের অর্থ ব্যয়ের আগে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরেও বড় ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ আপাতত বন্ধ থাকবে।
তবে বিদেশি সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বিশ্ববিদ্যালয় বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে দেওয়া বৃত্তি বা ফেলোশিপের আওতায় স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি অধ্যয়নের জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকবে। একইভাবে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে পরিচালিত প্রশিক্ষণেও অংশ নেওয়া যাবে।
পণ্য জাহাজীকরণ-পূর্ব পরিদর্শন এবং কারখানায় গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষার জন্য বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এখন থেকে কেবল জটিল প্রকৃতির পণ্য অথবা যেখানে আইনগতভাবে এ ধরনের পরিদর্শন বাধ্যতামূলক, শুধু সেসব ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা কারিগরি সনদপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি বিদেশ সফরের পরিবর্তে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব কাজ সম্পন্ন করাকেই অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
পরিপত্রে আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিচালন ও উন্নয়ন—উভয় বাজেটের প্রতিটি ব্যয়ের ক্ষেত্রেই সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থ বিভাগ মনে করছে, ব্যয়সংযম, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সরকারি আর্থিক শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী হবে।













