বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), বাণিজ্য আইন, বৈশ্বিক বাজার বিশ্লেষণ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই)-কে একটি শক্তিশালী জাতীয় থিংক ট্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিএফটিআই সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের ৬৩তম পরিচালনা পর্ষদের সভায় সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুধু পণ্য রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাণিজ্য আইন, শুল্কনীতি, বাণিজ্যিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক গবেষণা এবং বৈশ্বিক নীতিগত পরিবর্তন বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করবে। সে কারণেই বিএফটিআইকে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গবেষণার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন এবং নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে গভীর গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যেই বিএফটিআইকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রয়োজনীয় অর্থায়নের কোনো ঘাটতি নেই। এতদিন মূল সমস্যা ছিল সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব। এখন সেই ঘাটতি দূর করে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও নীতি সহায়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি-বিধান, বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরিতে বিএফটিআইকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতায় বাণিজ্য, বাণিজ্য আইন ও অর্থনৈতিক নীতিবিষয়ক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বাণিজ্য আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।
বৈশ্বিক বাজার বিশ্লেষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী জানান, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর বাজার পরিস্থিতি, বাণিজ্যিক প্রবণতা, সরবরাহ শৃঙ্খল, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করবে বিএফটিআই। এসব গবেষণার ফলাফল সরকারের বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন এবং বেসরকারি খাতের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহার করা হবে।
সভায় বিএফটিআইয়ের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ড. মোস্তফা আবীদ খানের নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরিচালনা পর্ষদের সভায় জানানো হয়, দেশের বাণিজ্য নীতি শক্তিশালী করা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) সঙ্গে যৌথভাবে একাধিক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিএফটিআই। বর্তমানে বিদ্যমান বাণিজ্য আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে অ্যান্টি-এক্সপোর্ট বায়াস-এর প্রভাব, অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের জন্য দেশের বিমান টিকিটিং বাজারে প্রতিযোগিতার অবস্থা নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্য নীতি, আরজেএসসি নিবন্ধন ও রিটার্ন দাখিল, কর, ভ্যাট, কাস্টমস এবং আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া বিষয়ে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সভায় আরও জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বিএফটিআই ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যবসা বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা (পিজিডি) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইউএনডিপি, সানেম এবং ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (আইইআরএফ) সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে গবেষণা ও সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে একাধিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, শুল্ক সুবিধা হারানো, নতুন বাণিজ্য বাধা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। এমন বাস্তবতায় নীতিনির্ধারণে গবেষণাভিত্তিক একটি শক্তিশালী জাতীয় থিংক ট্যাংক গড়ে তুলতে পারলে তা দেশের রপ্তানি সক্ষমতা, বাণিজ্য কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।













