ফ্রি ট্রেড জোনে আমদানি সহজ করল বাংলাদেশ ব্যাংক

DSJ Web Photo July 16 2026 FreeTradeZone
ডিএসজে

দেশে উৎপাদনশিল্প ও বৈদেশিক বাণিজ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) কেন্দ্রিক আমদানির জন্য প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা কাঠামো চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ নীতিমালার মাধ্যমে ফ্রি ট্রেড জোনে পরিচালিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অনুমোদিত আমদানিকারক এবং লজিস্টিকস সেবাদাতাদের জন্য আমদানি, অর্থায়ন ও বৈদেশিক লেনদেনের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এ উদ্যোগ একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের সংযুক্তি বাড়াবে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেই ব্যবসা সহজ করবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব অথরাইজড ডিলার (এডি) ব্যাংকের কাছে পাঠিয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এফটিজেড-সংশ্লিষ্ট সব বৈদেশিক লেনদেন বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালার আওতায় পরিচালিত হবে। এসব লেনদেন পরিচালনায় এডি ব্যাংকের পাশাপাশি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (ওবিইউ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ফ্রি ট্রেড জোনে পরিচালিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নিবন্ধিত আমদানিকারক এবং লজিস্টিকস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে যুক্ত কোম্পানিগুলো কাঁচামাল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় আরও নমনীয়তা পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কনসাইনমেন্ট ভিত্তিক আমদানির অনুমোদন। এ ব্যবস্থায় বিদেশি সরবরাহকারী পণ্যের মালিকানা নিজের কাছেই রাখবে, যতক্ষণ না ওই পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে বা বিক্রি হচ্ছে। ফলে পণ্য গুদামে থাকাকালীন সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলো সেটিকে আমদানিকারকের সম্পদ বা ঋণঝুঁকি হিসেবে গণ্য করবে না। এতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগাম বড় অঙ্কের অর্থ আটকে রাখতে হবে না এবং কার্যকর মূলধনের ওপর চাপও কমবে।

সার্কুলারে ফ্রি ট্রেড জোনভিত্তিক বাণিজ্যিক লেনদেনের শ্রেণিবিন্যাসও স্পষ্ট করা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরের কোনো প্রতিষ্ঠান এফটিজেড থেকে পণ্য কিনলে তা আমদানি হিসেবে বিবেচিত হবে। আবার এফটিজেডের কোনো প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রি করলে বিক্রেতার জন্য তা রপ্তানি এবং ক্রেতার জন্য আমদানি হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত ইএক্সপি ও আইএমপি সংক্রান্ত সব বিধি অনুসরণ করতে হবে এবং সব ধরনের অর্থ পরিশোধ অবাধে রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রায় নিষ্পত্তি করতে হবে।

নতুন কাঠামোয় কনসাইনমেন্টের আওতায় আনা পণ্য ৪৮ থেকে ৬০ মাস পর্যন্ত ফ্রি ট্রেড জোনে সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ইউস্যান্স আমদানি, ক্রেতা ঋণ ও সরবরাহকারী ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ ২৭০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রচলিত স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

এডি ব্যাংকগুলোকে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো একই ধরনের বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোও প্রচলিত বিধিমালার সীমার মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়ন করতে পারবে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বহুজাতিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকার ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রি ট্রেড জোনে আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্য কাঠামো চালু হলে স্থানীয় উৎপাদনশিল্প, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাত উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সংযোগ বাড়বে, কাঁচামাল সংগ্রহ সহজ হবে, উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্য দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানির আঞ্চলিক ডিস্ট্রিবিউশন ও সাপ্লাই চেইন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার যে নীতিগত সংস্কার করছে, ফ্রি ট্রেড জোনে বৈদেশিক বাণিজ্যের এই নতুন কাঠামো তারই ধারাবাহিকতা। তবে এ নীতিমালার পূর্ণ সুফল পেতে হলে ফ্রি ট্রেড জোনের অবকাঠামো উন্নয়ন, কাস্টমস কার্যক্রমের ডিজিটালাইজেশন, দ্রুত শুল্ক নিষ্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিকস সুবিধা নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top