পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কঠোর নীতিমালায় নমনীয়তা এবং পুন: তফসিলকৃত ঋণ থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলোকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও’র মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার দাবি তুলেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা। বিশেষ করে, ব্যাংক খাতের পুন: তফসিলকৃত ঋণ পরিশোধের জন্য আইপিও’র মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বহুমুখী মিলনায়তনে এই বিষয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় পুঁজিবাজারের অংশীজন ও শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় নতুন পাবলিক ইস্যু আইনের অধীনে আবেদন এবং তালিকাভুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ভালো কোম্পানিও বৈশ্বিক নানা সংকট ও সমস্যার কারণে লোকসানে থাকতে পারে এবং তাদেরও পুন: তফসিলকৃত ঋণ থাকতে পারে। কিন্তু সংকটের সময় এই ঋণগুলো আইপিও’র অর্থ দিয়ে পরিশোধ করার সুযোগ থাকা উচিত। শুধুমাত্র আদর্শ পরিস্থিতি বিবেচনা করে কঠোর নীতি অনুসরণ করলেই হবে না; পরিস্থিতি বিবেচনায় নমনীয় হওয়া প্রয়োজন।
এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারে আইপিও’র অর্থ ব্যবহারে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে তেমন সীমাবদ্ধতা নেই, যেমনটা আমাদের দেশে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা করে আইপিও’র অর্থ ব্যবহার করে ঋণ পরিশোধের সুযোগ বৃদ্ধি করা উচিত। তিনি পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
ব্যাংকারদের সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন বলেন, উৎপাদনশীল বা সম্প্রসারণ কাজের জন্য নেওয়া ঋণকে আইপিও’র মাধ্যমে পরিশোধ করে মূলধন পুনর্গঠন করার সুযোগ থাকা উচিত। দেশের অর্থনীতি এবং নানা সংকট বিবেচনায় দুইবারের বেশি পুন: তফসিলকৃত নয় এমন ঋণকেও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বহাল রেখে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
তবে স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিডিবিএল চেয়ারম্যান তপন চৌধুরী কিছুটা সতর্ক অবস্থান নেন। তিনি বলেন, আইপিও’র অর্থ কোম্পানি বা প্রকল্পের জন্য লাভজনক হচ্ছে কি না তা বিবেচনা করা উচিত। শুধু গ্রুপের সুনাম বিবেচনায় নিয়ে কোনো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে আইপিও’র অর্থ ব্যবহার যথাযথ হবে না। স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলামও বলেন, কোম্পানির জন্য উপকারী হলে সুযোগ দেওয়া উচিত, তবে তা যাচাই-বাছাই করে করতে হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশন ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার কার্যকর সমাধান। তিনি দেশে পুঁজিবাজারের যথাযথ উন্নয়ন ও বিকাশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এমসিসিআই প্রেসিডেন্ট কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, দেশে স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করা হচ্ছে, যা নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন।
খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের বর্তমান নীতিনির্ধারকরা দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্বে থাকলেও ঐতিহাসিকভাবে তারা একটি আইপিও আনতে পারেননি। সরকারি কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত করতেও চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বর্তমান কমিশন। এর মধ্যে আইপিও বিধিমালায় উত্তোলিত অর্থের ব্যবহার কঠোর করায় বেসরকারি কোম্পানিও নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ‘প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও’র মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার: ইস্যুকারী কোম্পানির ঋণ পরিশোধ নাকি বিনিয়োগ’ শিরোনামে অংশীজনদের নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করে কমিশন। অনুষ্ঠিত বৈঠকটির উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী কোম্পানিগুলো আইপিও’র মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করে, তা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নেওয়া।
কমিশন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ অংশীজনদের আশ্বস্ত করে বলেন, কমিশন একটি গতিশীল পুঁজিবাজার গড়তে কাজ করছে। আইপিও’র অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আপনাদের মতামত মূল্যায়ন করে দেখা হবে। তবে কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেই কমিশন কাজ করবে। তিনি প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নমনীয়তার এই দাবি এমন এক সময়ে এলো যখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় ৩১ শতাংশ বা ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশই পুন: তফসিলকৃত ঋণ। অন্তত ১৭টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো শিল্প ঋণ দিতে সতর্ক হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এখন পুঁজিবাজারকে সহজ বিকল্প হিসেবে দেখছেন।













