নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে বড় বাধা কর কাঠামোর বৈষম্য: সিপিডি

Web Photo Card June 6 2026 CPD
ছবি: সিপিডির ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

দেশের বর্তমান কর কাঠামোর তীব্র বৈষম্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংস্থাটি স্পষ্ট করে বলেছে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণের এক ধরণের আত্মঘাতী লোভে এই খাত থেকে বের হতে পারছে না সরকার, যা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তির পথে বড় ধরণের কর কাঠামো বৈষম্য তৈরি করছে। নীতিগত এই বৈষম্যের কারণেই দেশে নতুন ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি আসার পথ এখনো মারাত্মকভাবে সংকুচিত রয়েছে। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিকারকদের অন্যায্য সুবিধা দিতে গিয়ে সরকার নিজেই প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।

আজ রবিবার (৭ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে রাজস্ব বৈষম্য: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সমাধান’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান সাজিদ এবং খালিদ মাহমুদ প্রমুখ। ব্রিফিংয়ে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় বিকল্প সমাধানের নানামুখী প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সরকারের রাজস্ব নির্ভরতা ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি আমদানিতে অনীহার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সরকার সবসময় পরোক্ষ করের মাধ্যমে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের সহজ চেষ্টা করে। বর্তমানে পেট্রোল ও ডিজেল চালিত যানবাহনের ওপর যে ধরণের কর কাঠামো রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে বৈদ্যুতিক যান বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো উৎসাহ নেই। উল্টো বৈদ্যুতিক যান, গ্রিড এবং বিদ্যুৎ সঞ্চয়কারী উপকরণের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক ও কর আরোপ করে রাখা হয়েছে। এর ফলে শিল্প, বাণিজ্যিক বা গৃহস্থালি—সব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে তেল-ভিত্তিক জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

রাজস্ব নীতিতে এক ধরণের বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে উল্লেখ করে সিপিডির এই গবেষণা পরিচালক কর কাঠামোর বৈষম্য ও রাজস্ব ক্ষতির সুনির্দিষ্ট খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানিতে শূন্য শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, অথচ সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপকরণের ওপর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট বহাল রাখা হয়েছে। যদি এলএনজি আমদানিতে সৌর বিদ্যুতের সমপরিমাণ ভ্যাট আরোপ করা হতো, তবে সরকারের বাড়তি ১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। একইভাবে, তেল, এলএনজি এবং কয়লার ওপর আরোপিত শুল্ক যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির শুল্ক হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হতো, তবে সরকার এলএনজি থেকে ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা এবং কয়লা থেকে ৬৬৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারতো। অর্থাৎ, আমদানিকারকদের অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার কারণে রাষ্ট্র নিজেই বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।

ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিকল্প প্রযুক্তিতে শুল্ক বাধা দেওয়ার নীতিও প্রশ্নবিদ্ধ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে সরকার প্রায়ই ডিজেলের দাম বাড়াতে চায় না। কিন্তু কৃষি সেচ, ট্রাক বা ব্যক্তিগত গাড়িতে ডিজেলের বিকল্প হিসেবে যে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব, সেগুলোর ওপর থেকে শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। যদি এই বিকল্প যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো হতো, তবে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আধুনিক সবুজ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতো। এতে সরকারের রাজস্ব হারানোর কোনো ভয় থাকতো না, কারণ ওই সব পরিবেশবান্ধব পণ্যের আমদানি বাড়লে সেখান থেকেও বড় অংকের রাজস্ব আসার নতুন সুযোগ তৈরি হতো।

জাতীয় বাজেটের নীতি নির্ধারণী দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলে ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী বা শক্তিশালী চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর প্রভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে রীতিমতো হিমশিম খায়। এই ধরণের অন্যায্য চাপের ফলে একটি বৈষম্যমূলক ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীস্বার্থের রাজস্ব কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে সবুজ রাজস্ব নীতি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থাকছে।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান ও লাগামহীন ভর্তুকি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সিপিডি। সংস্থাটি মনে করছে, সরকার যে চড়া দামে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনে এবং যে পাইকারি মূল্যে তা বাজারে বিক্রি করে, এর মধ্যকার বিশাল ব্যবধানই হচ্ছে সরকারের বাড়তি লোকসান ও ব্যয়ের মূল কারণ। এই সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল ও অসম পরিস্থিতি থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে এসে একটি প্রতিযোগিতামূলক, বাজারবান্ধব এবং পরিবেশবান্ধব কর কাঠামো গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top