জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ দূষণ হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে তাল মেলাতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে গাড়ি আমদানির কর কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে সরকার। বাজেটে আগামী অর্থবছর থেকে দেশে ইলেকট্রিক কার এবং হাইব্রিড প্রযুক্তির গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে শুল্ক-করে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এর বিপরীতে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং মাত্রাতিরিক্ত তেল সাশ্রয়হীন প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির (অকটেন-পেট্রোল) লাক্সারি গাড়ির ওপর করের বোঝা আরও ভারী করার কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট আগামীকাল বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে পেশ করার কথা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন।
এনবিআরের শুল্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্পূর্ণ ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক (এসডি) ২০ শতাংশ থেকে এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব গাড়ির বাজারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। একই সাথে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আনতে ১ হাজার ৫০০ সিসি পর্যন্ত হাইব্রিড গাড়ির শুল্ক-কর বর্তমানের ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি এই ১৫০০ সিসি পর্যন্ত হাইব্রিড গাড়িগুলোর অগ্রিম কর (এআইটি) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং রেজিষ্ট্রেশন ফি এক-চতুর্থাংশ মওকুফ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুল্ক প্রশাসন।
তবে মাঝারি হাইব্রিডের তুলনায় বড় সিসির হাইব্রিড এবং প্রচলিত জ্বালানি চালিত বিলাসবহুল গাড়ির ওপর করের চাবুক বসানো হচ্ছে অত্যন্ত কঠোরভাবে। নতুন খসড়া অনুযায়ী, ১৫০১ সিসি থেকে ২ হাজার সিসি পর্যন্ত হাইব্রিড গাড়ির সম্পূরক শুল্ক ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ এবং ২ হাজার সিসির ওপরের হাইব্রিড জিপ বা এসইউভির কর ৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ হাইব্রিড প্রযুক্তির হলেও বড় ও বিলাসবহুল ক্যাটাগরির গাড়ি আমদানিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা গুণতে হবে আমদানিকারক ও ধনী ক্রেতাদের।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসছে প্রচলিত পেট্রোল ও অকটেনচালিত জীবাশ্ম জ্বালানির লাক্সারি সেডান ও বড় এসইউভি গাড়ির ওপর, যেখানে ২ হাজার সিসি থেকে ৩ হাজার সিসি পর্যন্ত গাড়ির সম্পূরক শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ শতাংশ করা হচ্ছে।
এছাড়া ৩ হাজার সিসির ওপরের অতি-বিলাসবহুল ক্রুজার বা জিপ আমদানির ক্ষেত্রে এই সম্পূরক শুল্কের হার ১৫০ শতাংশের সর্বোচ্চ সীমা ভেঙে সরাসরি ২৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে বহু-গাড়ি মালিকানা নিরুৎসাহিত করতে এবং রাজপথে কার্বন নিঃসরণ কমাতে পরিবারে দ্বিতীয় বা তার অধিক গাড়ি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বার্ষিক পরিবেশ কর বা বিশেষ কার্বন সারচার্জ এক লাফে দ্বিগুণ করার নীতি গ্রহণ করেছে এনবিআর।
অটোমোবাইল খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য শক্তির রূপান্তরের এই সময়ে ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ির কর কমানোর এই সরকারি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দূরদর্শী। এর ফলে দেশের বাজারে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ির দাম এক ধাক্কায় কয়েক লাখ টাকা কমে আসবে, যা সাধারণ ক্রেতাদের হাইব্রিড প্রযুক্তির দিকে আকৃষ্ট করবে এবং জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি তেলের আমদানির ওপর বিশাল ভরতুকির চাপ কমাতে সাহায্য করবে।
তবে ২ হাজার সিসির ওপরের তেলের গাড়িতে শুল্ক ব্যাপক বাড়ায় বিলাসবহুল গাড়ির বাজার সংকুচিত হবে এবং নতুন এই শুল্ক ছাড়ের সুবিধা যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীরা পান, সে জন্য বাজার মনিটরিং জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।













