তিন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ‘একক দল’ হিসেবে কাজ করার আহ্বান

Web Photo Card June 7 2026 BSECReform2026
ছবি: ডিএসজে

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কখনোই একা একটি সফল পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে পারবে না, যদি না দেশের প্রধান তিনটি স্তম্ভ অর্থাৎ বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি একক দল হিসেবে সমন্বিতভাবে কাজ করে। একটি সংস্থা নিয়ম বানালে অন্য সংস্থা যদি তার উল্টো সার্কুলার দেয় কিংবা করের জটিলতা বাড়িয়ে দেয়, তবে পুঁজিবাজার কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না। দেশের পুঁজিবাজারকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যেতে এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় ও নিবিড় সহযোগিতা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

গতকাল শনিবার (৬ জুন) সন্ধ্যায় ‘সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশ’-এর ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান তিন প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এই ত্রিমুখী ও সমন্বিত একক দলগত কাজের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেন।

মাসুদ খান বলেন, আইসোলেশন বা একা একা নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনবিআর-কে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি অডিটরদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন, যাদের অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি এবং এফআরসি —তিন জায়গায় আলাদাভাবে দৌড়াতে হয়। এই অপচয় ও হয়রানি বন্ধে একটি মাত্র কেন্দ্রীয় পোর্টাল বা সমন্বিত বডির মাধ্যমে একক প্যানেল তালিকা ব্যবহার করার প্রস্তাব দেন তিনি। এছাড়া সরকারি সিকিউরিটিজ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকে ট্রেড হয় এবং যা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়—তার স্প্রেড ও নিয়মের অমিল দূর করে একই নিয়মে আনার তাগিদ দেন তিনি।

ত্রৈমাসিক রিপোর্টের সরলীকরণ
রেগুলেশনের ক্ষেত্রে বিএসইসি চেয়ারম্যানের নীতি পরিষ্কার—যেখানে প্রয়োজন সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, আর যেখানে সম্ভব সেখানে নিয়মকানুনের সর্বোচ্চ সরলীকরণ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক হিসাবমান (আইএএস-৩৪) অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক বিবরণী অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাংলাদেশে পুরো সেট অ্যাকাউন্টস ও বিস্তারিত নোট দাবি করা হয়। এখানেই শেষ নয়, বিবরণী জমা দেওয়ার পর স্টক এক্সচেঞ্জগুলো থেকে ব্যাংক চার্জ বা স্থায়ী সম্পদের বিবরণী চেয়ে অপ্রয়োজনীয় ‘প্রেমপত্র’ পাঠিয়ে কোম্পানিগুলোকে হয়রানি করা হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে এই রিপোর্টিং প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ সহজ ও গতিশীল করার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, এই ধরণের অপ্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্সের নামে হয়রানি অবিলম্বে বন্ধ হতে হবে।
কাগজের যুগ ও আমলাতান্ত্রিক ‘হরর স্টোরি’র অবসান
পুঁজিবাজারের বর্তমান নথিপত্র ব্যবস্থাপনাকে একটি ‘হরর স্টোরি’ বা ভয়ের গল্পের মতো আখ্যা দিয়ে মাসুদ খান বলেন, “আজ ২০২৬ সালেও মার্চেন্ট ব্যাংক ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর যাবতীয় রিপোর্টিং, আইপিও বা রাইটস ইস্যুর আবেদন বস্তা বস্তা কাগজে করা হয়। ঈশ্বরের দোহাই, আমরা কি এখনো প্রস্তর যুগে বাস করছি?” এই কাগজের ফাইল সংস্কৃতির কারণে কোনো স্বচ্ছতা থাকে না, ফাইল টেবিলে আটকে থাকে এবং অনেক সময় চিরতরে ‘হারিয়েও’ যায়। এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে পুরো ইকোসিস্টেমকে শতভাগ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা হবে, যাতে ডিজিটাল ট্র্যাকারের মাধ্যমে ফাইলের অবস্থান সবাই দেখতে পান।

‘বিশেষ ট্যাক্স সার্কেল’ ও আগ্রাসী ডাইরেক্ট লিস্টিং
বর্তমানে বাজারে ভালো বা বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানির সংখ্যা ১০ শতাংশেরও কম উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, বিএসইসিকে এখন একটি দক্ষ ‘সেলসম্যানের’ ভূমিকা পালন করতে হবে। ভালো করপোরেট ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে আকৃষ্ট করতে কর ছাড়ের জন্য এনবিআরের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় না থেকে তিনি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য একটি পৃথক ও হয়রানিমুক্ত ‘ট্যাক্স সার্কেল’ গঠনের প্রস্তাব দেন, যেখানে কর কর্মকর্তারা অডিটের নামে ঘন ঘন হয়রানি বা কড়াকড়ি করতে পারবেন না। পাশাপাশি, নতুন মূলধন তোলার প্রয়োজন না থাকলেও বহুজাতিক ব্যাংক, এমএনসি এবং সুশাসিত বড় বড় লোকাল করপোরেটগুলোকে ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং’ বা সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে দ্রুত বাজারে নিয়ে আসতে আগ্রাসীভাবে কাজ করবে বিএসইসি।

ফান্ডের বেআইনি বিনিয়োগ বন্ধ
পুঁজিবাজারকে উদীয়মান বাজারে রূপান্তর করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের গভীরতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, দেশের আইন অনুযায়ী প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অর্থ কেবল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে রাখার কথা থাকলেও, বহু বড় কোম্পানি আইন অমান্য করে এই টাকা ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও দুর্বল ব্যাংকে রেখে ধরা খাচ্ছে। বিএসইসি এই বেআইনি চর্চার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করবে এবং নির্ধারিত ২৫ শতাংশ ফান্ডের অর্থ শেয়ারবাজারে নিয়ে আসার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করবে।

রিয়াল-টাইম আইনি ব্যবস্থা
বিএসইসি কারসাজির দায়ে শত শত কোটি টাকা জরিমানা করলেও আদালতের ধীরগতি এবং উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে এ পর্যন্ত মাত্র ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে। উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থার ধীরগতির সমালোচনা করে একটি কৌতুকচ্ছলে তিনি বলেন, এখানে ব্যাংক বা বাজার লুট করে জামিন নিয়ে রাজকীয় জীবন কাটিয়ে মারা যাওয়া সম্ভব হলেও চীনে বিচার তাৎক্ষণিক ও কঠোর। এই অচলাবস্থা কাটাতে বিএসইসি বিচার বিভাগের সাথে কথা বলে সিকিউরিটিজ আইনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি ও বকেয়া জরিমানা আদায়ের জন্য বিশেষ ‘রিয়াল-টাইম আইনি ব্যবস্থা’ গড়ে তুলবে।

তাত্ত্বিক বন্ড ও ডেরিভেটিভস বাজারে লাগাম
বন্ড ও ডেরিভেটিভস মার্কেট নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক বড় ব্যবসায়ীও এখনো বন্ডের ‘বি’ অক্ষরটিই বোঝেন না। তাই বাজারে নতুন ও জটিল কোনো ফিন্যান্সিয়াল প্রোডাক্ট তাড়াহুড়ো করে চালু করার আগে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তবে ফিক্সড ইনকামের বিকল্প হিসেবে করপোরেট বন্ডের উন্নয়ন অবশ্যই করা হবে।

রেগুলেটরদের অহংকারী সংস্কৃতির অবসান
বিগত কয়েক বছর ধরে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে কোনো কার্যকর সংলাপ ছিল না উল্লেখ করে মাসুদ খান বলেন, ক্যাপিটাল মার্কেট রিফর্ম কমিটির চমৎকার পরামর্শগুলোর সিংহভাগই আলোর মুখ দেখেনি, কারণ তৎকালীন রেগুলেটরেরা তাদের ‘পরম জ্ঞানে’ মনে করতেন যে তারাই সবকিছু বেশি ভালো বোঝেন। তিনি স্পষ্ট জানান, তিনি এই অহংকারী সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করেন না। পুরোনো ও কৌতুকপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি আইপিও নিয়ম ও মার্জিন রুলস অংশীজনদের সাথে বসে সম্পূর্ণ সহজ করা হবে। স্ক্রিপ্ট ট্রেডিং বা টি+১ সেটেলমেন্ট দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের হয়রানি বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি এবং এফআরসির আলাদা আলাদা অ্যাক্রেডিটেশনের পরিবর্তে একটি একক কেন্দ্রীয় পোর্টাল বা প্যানেল তালিকা ব্যবহার করার সহজ উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top