ডিএসইতে অন্যায্য ছাঁটাই ও শীর্ষ পদে নিয়োগ কেলেঙ্কারির অভিযোগ

Web Photo Card June 29 2026 DSETermination
ডিএসজে

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি (ডিএসই) থেকে ‘পুনর্গঠন’–এর নামে তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ মোট আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আকস্মিকভাবে চাকরিচ্যুত করার ঘটনায় নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের অভিযোগ, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অসদাচরণ, অদক্ষতা বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও গত ২৫ জুন তাৎক্ষণিকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ডিএসইর বরখাস্ত হওয়া তিন উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) গত ২৮ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে যৌথভাবে লিখিত আবেদন করেছেন। একই আবেদনে তাঁরা ডিএসইর শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং ক্যারিয়ার সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে স্বাধীন তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন।

আবেদনকারী তিন কর্মকর্তা হলেন—মো. আব্দুর রাজ্জাক, মো. শাহীন সারওয়ার হোসেন এবং মো. আব্দুল লতিফ। তাঁদের প্রত্যেকেই প্রায় ১৯ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ডিএসইতে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্বে ছিলেন।

বিএসইসিতে দেওয়া আবেদনে তাঁরা উল্লেখ করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অসদাচরণ, কর্মদক্ষতার ঘাটতি বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল না। এছাড়া কোনো অনুমোদিত পুনর্গঠন পরিকল্পনা, সংশোধিত অর্গানোগ্রাম কিংবা পরিচালনা পর্ষদের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছাড়াই সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ায় চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

তাঁদের ভাষ্য, দেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জ এবং একটি নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং পুরো পুঁজিবাজারের সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্যও নেতিবাচক বার্তা বহন করে।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, নোটিশ পিরিয়ড অনুসরণ না করে ১২০ দিনের গ্রস বেতন পরিশোধের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের কোনো জরুরি প্রশাসনিক প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করায় ডিএসইকে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যয় বহন করতে হয়েছে।

একই সঙ্গে চাকরিচ্যুতির দিনই তাঁদের কর্মস্থল ছাড়তে বাধ্য করা হয় এবং কম্পিউটার, ই-মেইল ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেমে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে ব্যক্তিগত নথি, কর-সংক্রান্ত রেকর্ড এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের সুযোগ থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিএসইসির কাছে একাধিক প্রতিকারমূলক পদক্ষেপের আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। এর মধ্যে রয়েছে—ডিএসইর কথিত পুনর্গঠন-সংক্রান্ত বোর্ড রেজল্যুশন ও সংশ্লিষ্ট সব নথি তলব, নোটিশ পিরিয়ড অনুসরণ না করার কারণ অনুসন্ধান, বিতর্কিত নিয়োগ ও পদোন্নতির বৈধতা যাচাই এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে তাঁদের পুনর্বহালের নির্দেশনা প্রদান।

এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুনর্গঠিত ডিএসই পরিচালনা পর্ষদের আমলে শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিএসইসিতে জমা দেওয়া আবেদনে সাত কর্মকর্তার নিয়োগ, পদোন্নতি এবং ক্যারিয়ার সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

আবেদনে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ আসাদুর রহমান যখন ডিএসইর কোম্পানি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন প্রতিষ্ঠানের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) পদে নিয়োগের জন্য আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে তিনি ওই পদের জন্য আবেদন করেননি এবং নির্ধারিত নিয়োগ বা সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ায়ও অংশ নেননি। তা সত্ত্বেও প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তাঁকে সরাসরি সিওও পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ডিএসইর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) পদে ড. মো. আসিফুর রহমানের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, এই উচ্চপর্যায়ের কারিগরি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, মানবসম্পদ নীতিমালা এবং প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি অনুসরণ করা হয়নি।

ডিএসইর তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের কর্মকর্তা এএনএম হাসানুল করিমকে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সাংগঠনিক কাঠামো লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, ডিএসইর অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে আইসিটি বিভাগের জন্য মহাব্যবস্থাপক নামে কোনো পদের অস্তিত্ব নেই। ফলে বিদ্যমান কাঠামোর বাইরে গিয়ে তাঁকে পদোন্নতি ও সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক তাজুল ইসলামের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী কর্মকর্তারা। তাঁদের অভিযোগ, শুরুতে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে সরাসরি স্থায়ী মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে উচ্চ বেতন ও সুযোগ-সুবিধাসহ নিয়োগ দেওয়া হয়। আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, তিনি ডিএসইর তৎকালীন স্বতন্ত্র পরিচালক শাহনাজ সুলতানার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। যদিও এই সম্পর্কের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ডিএসইর মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হাসান তারেক চৌধুরীর নিয়োগ নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবেদনকারীদের ভাষ্য, তিনি ডিএসইর আরেক স্বতন্ত্র পরিচালক সৈয়দা জাকেরিন বখত নাসিরের আত্মীয়। তাঁদের অভিযোগ, এ গুরুত্বপূর্ণ পদে কোনো উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেবল অভ্যন্তরীণভাবে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বানের মাধ্যমে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিএসইর রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং সৈয়দ মামুদ জুবায়ের নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটির (এনআরসি) প্রচলিত সুপারিশ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই পদোন্নতি ও অতিরিক্ত ক্যারিয়ার সুবিধা পেয়েছেন। এসব নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী কর্মকর্তারা।

আবেদনকারীদের অভিযোগ, এসব নিয়োগ, পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার সুবিধা প্রদানের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একই সময়ে সংঘটিত একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অংশ। ফলে পুরো বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভের নয়, বরং ডিএসইর করপোরেট সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও তাঁরা দাবি করেছেন।

তাঁদের মতে, দেশের প্রধান পুঁজিবাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে যদি নিয়োগ, পদোন্নতি ও জনবল ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা অনুসরণ না করা হয়, তাহলে তা শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বাজারের গ্রহণযোগ্যতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসইর স্বতন্ত্র পরিচালক এবং নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দা জাকেরিন বখত নাসির এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি ডিএসজেকে বলেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো আপত্তি নেই। তবে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ ধরনের বিষয়ে কেবল ডিএসইর চেয়ারম্যান অথবা ব্যবস্থাপনা পরিচালকই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেবেন।

এরপর ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার এবং চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কেউ কল রিসিভ করেননি। ফলে আবেদনকারীদের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top