ছাঁটাই-নিয়োগ থেকে এনআরসি, ডিএসইজুড়ে তদন্ত

DSJ Web Photo BSEC
ডিএসজে

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আকস্মিক চাকরিচ্যুতির অভিযোগ এবার গড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ, পদোন্নতি, শীর্ষ কর্মকর্তাদের শেয়ার ব্যবসা, স্বার্থের সংঘাত এবং করপোরেট সুশাসনের প্রশ্নে। এসব অভিযোগের তদন্তে পৃথক দুটি উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর একটি চাকরিচ্যুতির অভিযোগ ঘিরে, অন্যটি ডিএসইর শীর্ষ ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ওঠা বিস্তৃত অনিয়ম ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ নিয়ে।

ডিএসই ঘিরে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম।

বিএসইসির ১০ আগস্টের এক আদেশে তিন কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিকে ডিএসইর আর্থিক ব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসন ও নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি শীর্ষ কর্মকর্তাদের শেয়ার লেনদেন এবং তাঁদের পরিবার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের পুঁজিবাজারের ব্যবসায় সম্পৃক্ততার বিষয়ও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। কমিটিকে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়েছে।

দুটি তদন্তের একটির সূত্রপাত ডিএসইর ১৪১ নম্বর শেয়ারহোল্ডার সদস্য ডন সিকিউরিটিজের অভিযোগ থেকে। প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন ইতোমধ্যে বিএসইসি বাতিল করেছে। ডন সিকিউরিটিজ ডিএসইর বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি ও অনিয়মিত নিয়োগের অভিযোগ তুলেছে। বিএসইসির আদেশে এসব অভিযোগের পাশাপাশি ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের—বিশেষ করে সিওও, জিএমসহ অন্যদের—শেয়ার ব্যবসায় জড়িত থাকার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা, তাঁর পরিবারের সদস্য বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ ডিএসই কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিদ্যমান ফিডিউশিয়ারি সম্পর্ক ব্যবহার করে পুঁজিবাজারের অন্য কোনো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

অন্যদিকে, গত ২৫ জুন থেকে তিন দফায় মোট ২৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কোনো নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের ভাষ্য, ডেকে নিয়ে হাতে চাকরিচ্যুতির চিঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফায় চাকরিচ্যুত তিন ডিজিএম মো. আব্দুর রাজ্জাক, মো. শাহীন সারওয়ার হোসেন ও মো. আব্দুল লতিফ বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগে বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, অদক্ষতা বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও পুনর্গঠনের নামে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে গত ২ আগস্ট ডিএসইর দাবি, চাকরির অবসান হয়েছে শ্রম আইন ও প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস রুল মেনে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, মোট প্রায় ৩৫০ কর্মীর মধ্যে ১৭ জনের চাকরির অবসান ঘটানো হয়েছে এবং এটি ২০২২ সাল থেকে চলমান সাংগঠনিক রূপান্তরের অংশ। চাকরিচ্যুতদের চার মাসের পরিবর্তে ছয় মাসের বেতনসহ আইনগত পাওনা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে ডিএসই।

এই বিরোধের মধ্যে মো. আব্দুল লতিফের অভিযোগটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ২৩ জুলাই বিএসইসিকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। চিঠিতে লতিফের ‘বেআইনি ও একতরফা চাকরিচ্যুতির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন’-এর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এরপরই চাকরিচ্যুতি-সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য পৃথক তদন্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বিএসইসিতে সাবেক তিন ডিজিএমের যৌথ আবেদনে ডিএসইর সাত কর্মকর্তার নিয়োগ, পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে পৃথক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

এর মধ্যে মোহাম্মদ আসাদুর রহমান কোম্পানি সেক্রেটারি থাকা অবস্থায় সিওও পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলেও তিনি আবেদন বা নির্ধারিত সাক্ষাৎকারে অংশ না নিয়েই সরাসরি ওই পদে নিয়োগ পেয়েছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। সিটিও পদে ড. মো. আসিফুর রহমানের নিয়োগে প্রচলিত প্রশাসনিক ও মানবসম্পদ নীতি অনুসরণ না করার অভিযোগও তোলা হয়েছে। আইসিটি বিভাগের এএনএম হাসানুল করিমকে অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে জিএম পদ না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের জিএম তাজুল ইসলামকে প্রথমে ডিজিএম পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে পরে সরাসরি স্থায়ী জিএম পদে উচ্চ বেতন-সুবিধায় নিয়োগ এবং মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের জিএম হাসান তারেক চৌধুরীকে উন্মুক্ত নিয়োগ ছাড়াই নিয়োগের অভিযোগও আবেদনে রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।

তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ডিএসইতে যোগ দেওয়ার পরও উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার শেয়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তদন্তেই উঠে এসেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।েএ বিষয়টিও এখন বিএসইসির তদন্তের আওতায় এসেছে।

বিএসইসির ১০ আগস্টের আদেশে আরও বলা হয়েছে, শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগে রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আরএসি), রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট (আরএডি), নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি (এনআরসি) এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে।

বিশেষ করে এনআরসি সংশ্লিষ্ট নিয়োগ, পুনর্নিয়োগ ও ক্যারিয়ার সুবিধা প্রদানে নীতিমালা অনুসরণ করেছে কি না, সেটিও তদন্তের জালে রয়েছে। পাশাপাশি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ১৯ ধারার গোপনীয়তা-সংক্রান্ত বিধান ডিএসই ব্যবস্থাপনা ও শীর্ষ কর্মকর্তারা যথাযথভাবে মেনেছেন কি না, তাও যাচাই করবে কমিটি।

বিএসইসির গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন কমিশনের পরিচালক এএসএম মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ শামসুর রহমান এবং অতিরিক্ত পরিচালক মো. মতিউর রহমান। ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফলে ডিএসইর সাম্প্রতিক চাকরিচ্যুতির ঘটনা এখন আর শুধু জনবল পুনর্গঠনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। ছাঁটাইয়ের বৈধতা থেকে নিয়োগ ও পদোন্নতি, এনআরসির ভূমিকা, শীর্ষ কর্মকর্তাদের শেয়ার ব্যবসা, স্বার্থের সংঘাত এবং করপোরেট সুশাসন—সবকিছু মিলিয়ে দেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জের প্রশাসনিক কাঠামোই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর পরীক্ষার মুখে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top