দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ থামানো সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বর্তমানে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, এই পরিস্থিতি কেবল নতুন হাসপাতাল নির্মাণ বা আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলানো যাবে না। রোগীদের আস্থা অর্জনে চিকিৎসকদের মানবিক আচরণ, পেশাগত দক্ষতা এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবাই হবে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ডিএমসি ডে-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশের হাজারো মানুষ প্রতিবছর উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে যান। এতে শুধু বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাই দেশ ছাড়ছে না, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার ঘাটতিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
“আমরা কেন এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারব না? কেন আমাদের চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারব না? এটি সম্ভব আপনাদের মানবিক আচরণ এবং যথাযথ চিকিৎসাসেবার মাধ্যমেই,”—চিকিৎসক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলতি বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকার ইতোমধ্যে ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্ট ভালভ, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ক্যাথেটার, ইনট্রাওকুলার লেন্স এবং ক্যানসারের ওষুধ তৈরির কাঁচামালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপকরণের ওপর শুল্ক ও কর কমিয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো নিজস্ব অর্থে চিকিৎসা ব্যয় বহন করেন। ফলে চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর কর কমানোর সুফল সরাসরি সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।
রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা কমিয়ে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে দেশের ৫১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে।
তিনি বলেন, দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ গ্রামে বাস করলেও বর্তমানে মাত্র পাঁচটি উপজেলায় ১০০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে। এই বৈষম্য দূর করতেই উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, উন্নীত হওয়া প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকবে, যাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও অস্ত্রোপচার ও জরুরি চিকিৎসাসেবা বাধাগ্রস্ত না হয়।
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, হাসপাতাল পরিষ্কার রাখা শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্ব নয়; চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মী—সবারই এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে।
জাপানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিশ্বকাপ ফুটবল শেষে জাপানি দর্শকেরা নির্দেশনা ছাড়াই স্টেডিয়াম পরিষ্কার করেছিলেন। বাংলাদেশেও হাসপাতালকে পরিচ্ছন্ন রাখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
“আধুনিক ভবন নির্মাণই যথেষ্ট নয়; পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, উন্নত চিকিৎসা গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বক্তব্যে তিনি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সময় চিকিৎসকদের আন্তরিক সেবার কথাও স্মরণ করেন। তার ভাষ্য, চিকিৎসকদের সেই মানবিকতা ও নিষ্ঠা অর্থ দিয়ে বিদেশ থেকে কেনা সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে “বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা” শীর্ষক মতবিনিময় পর্বেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সমস্যা ধাপে ধাপে সমাধানের আশ্বাস দেন।
এর আগে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে ডিএমসি ডে-২০২৬-এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জোবাইদা রহমান। পরে তারা কলেজ প্রাঙ্গণে একটি অর্জুন ও একটি নিমগাছের চারা রোপণ করেন এবং কলেজের ইতিহাস ও অবদান নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র উপভোগ করেন।













