গ্যাস-পানি সংকটে অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিনিয়োগ

DSJ Web Photo EconomicZones
ছবি- বিজিএমইএ

অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্লট বরাদ্দ পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ইউটিলিটি সুবিধা না পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও শিল্প-পানি সরবরাহের ঘাটতির পাশাপাশি কারখানা পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই সার্ভিস চার্জ আরোপ এবং নীতিগত জটিলতা বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি বদলাতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বেজিয়া।

সোমবার (১০ আগস্ট) উত্তরার বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে বিজিএমইএ ও বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশনের (বেজিয়া) উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নতুন বিনিয়োগ বাড়ানো, বিদ্যমান অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করা এবং নীতিগত প্রতিবন্ধকতা কমাতে সরকারের কাছে যৌথভাবে দাবি তুলে ধরার বিষয়ে দুই সংগঠন একমত হয়।

সভায় বেজিয়ার সভাপতি এম এ জব্বার বলেন, অনেক উদ্যোক্তা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্লটের জন্য বিপুল অর্থ পরিশোধ করলেও অবকাঠামো ও ইউটিলিটি সুবিধা ধীরগতিতে পাওয়ায় তাদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে পুরোপুরি কার্যকর করার জন্য নির্ধারিত পাঁচটি সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩৯ হাজার একর জমির বিপরীতে মাত্র ২৭টি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে। মোট বরাদ্দকৃত জমির মাত্র ৩৭ শতাংশ বর্তমানে পরিচালনাধীন রয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়।

বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি, প্রতিশ্রুত নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সুবিধা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহৃত ইউটিলিটি বিলের ওপর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) আরোপিত সার্ভিস চার্জ সম্পূর্ণ মওকুফ করা। উদ্যোক্তাদের মতে, কারখানা পূর্ণাঙ্গভাবে সচল হওয়ার আগে অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ বিনিয়োগকারীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

গ্যাস ও শিল্প-পানির সংকট সমাধানের বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পায়। শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু ও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সমতা নিশ্চিত করতে জোনভুক্ত শিল্পকারখানার জন্য খাতভিত্তিক সমপরিমাণ নগদ প্রণোদনার দাবিও জানানো হয়। দুই সংগঠনের মতে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনার ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকলে এসব অঞ্চলে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যেতে পারে।

সভায় ভ্যাট কাঠামোর একটি জটিলতা দূর করার দাবিও ওঠে। মাস্টার লিজ হোল্ডার এবং পরবর্তী পর্যায়ের সাব-লিজ গ্রহীতা—উভয় স্তরে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেওয়ার বাধ্যবাধকতাকে দ্বৈত করারোপ হিসেবে উল্লেখ করে লিজ ট্যারিফের ওপর ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফের দাবি জানানো হয়।

রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য প্রচ্ছন্ন রপ্তানি ব্যবস্থার প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। দেশীয় বন্ড-লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারকদের কাছে প্রচ্ছন্ন রপ্তানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে EXP ও EP ছাড়া প্রচ্ছন্ন রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৯৯ বছরের লিজের মিউটেশন ব্যাংকযোগ্য করা এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হয়। বিনিয়োগকারীদের জন্য জমি, অনুমোদন, ইউটিলিটি ও অন্যান্য সরকারি সেবা দ্রুত পাওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সভায় বেজিয়ার সভাপতি এম এ জব্বার জানান, চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিজিএমইএর ৪১টি ইউনিট ইনভেস্টর রয়েছে। ফলে গার্মেন্টস খাতের জাতীয় ও নীতিগত স্বার্থের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে দুই সংগঠনের একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক অঞ্চলে টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে বেজিয়ার পরিচালনা বোর্ডে বিজিএমইএর একজন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন এম এ জব্বার। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানান এবং দ্রুত সংগঠনের পক্ষ থেকে একজন যোগ্য প্রতিনিধি মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

সভায় বিজিএমইএর পক্ষে নেতৃত্ব দেন সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান। বেজিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সভাপতি এম এ জব্বার। উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহসভাপতি মো. হালিমুজ্জামান, পরিচালক দেলোয়ার এইচ টিটু, সিইও ড. অপরূপ চৌধুরী এবং সদস্য মো. মুস্তাফিজুর রহমান।

দুই সংগঠনের নেতারা মনে করেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু জমি বরাদ্দ যথেষ্ট নয়; প্রতিশ্রুত অবকাঠামো, গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎসহ ইউটিলিটি, প্রতিযোগিতামূলক প্রণোদনা এবং সহজ প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান হলে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নতুন বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যমান বিনিয়োগও দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারে।

সভা শেষে বিজিএমইএ ও বেজিয়ার নেতারা আশা প্রকাশ করেন, তাদের যৌথ পলিসি অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে বেজা অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত জটিলতা নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top