দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংকট আরও গভীর হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে ভবিষ্যৎ খেলাপির ঝুঁকিতে থাকা ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রকাশ্য খেলাপি ঋণের বাইরে থাকা ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট’ (এসএমএ) নামে পরিচিত উচ্চ ঝুঁকির এই ঋণগুলো আগামী কয়েকটি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এসএমএ ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। মাত্র ১৫ মাসে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বেড়েছে ৮৮ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা বা প্রায় ২০২ শতাংশ। ফলে একসময় সীমিত পরিসরে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ এখন ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের চাপের উৎস হয়ে উঠেছে। তিন মাস আগে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৩৭৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
এসএমএ ঋণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে গণ্য না হলেও এসব ঋণকে ভবিষ্যৎ খেলাপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ গ্রাহকেরা নির্ধারিত সময়মতো কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় এসব হিসাব এই শ্রেণিতে স্থান পায়।
ব্যাংকভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসএমএ ঋণের বড় অংশ কয়েকটি বড় বেসরকারি ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে এসএমএ ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা, যার প্রায় ৮৭ শতাংশই বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর; যার পরিমাণ ৳১ লাখ ১৪ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উচ্চ ঝুঁকির এই ঋণ রয়েছে ১৬ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকার। এসব ব্যাংকে ঋণ আদায়ে দুর্বলতা এবং বড় গ্রাহকদের কিস্তি পরিশোধে অনিয়মের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
ব্যাংকগুলো নিজেদের ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার দেখাতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে খেলাপি ঋণের গ্রস হার সাময়িকভাবে কম রাখতে এই বিপুল পরিমাণ আদায় অযোগ্য ঋণকে জোরপূর্বক এসএমএ অ্যাকাউন্টে পার্ক করে রাখছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভবিষ্যৎ খেলাপির ঝুঁকিতে থাকা বা স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঋণ ধারণ করছে দেশের বেসরকারি খাতের বৃহত্তম ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকটির এসএমএ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। গ্রাহকদের কিস্তি দেওয়ার কোনো সদিচ্ছা না থাকায় এর এসএমএ ঋণের পুরোটাই আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মূল খেলাপিতে রূপ নেওয়ার চূড়ান্ত ঝুঁকিতে রয়েছে।
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের আমল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এই ব্যাংকটিতে নজিরবিহীন অনিয়ম হয়েছে। মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের ৫০.৮৮ শতাংশ। গত তিন মাসে ব্যাংকটিতে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা।
এরপর রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি), যেখানে প্রায় ১২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার ঋণ এসএমএ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। চলতি মার্চ শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১০ হাজার ৭৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১৬ শতাংশ। এসএমএতে থাকা বিশাল ঋণের কারণে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আগামী কয়েক মাসে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার ফাঁদে পড়েছে। উল্লেখ্য, ইউসিবি থেকে নামে-বেনামে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১১৫ কোটি টাকা।
ঝুঁকিপূর্ণ এসএমএ ঋণের দিক থেকে তালিকায় এরপরের অবস্থানে রয়েছে সমস্যাগ্রস্ত ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, যেখানে এসএমএতে আটকে রয়েছে ৮ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। আওয়ামী আমলে সিকদার পরিবারের লুটপাটের শিকার এই ব্যাংকটি বেশ কয়েক বছর ধরেই আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৫৭ শতাংশ।
দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক এবি ব্যাংক পিএলসি দীর্ঘদিন ধরেই মূলধন ও প্রভিশন সংকটে ভুগছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৪ শতাংশ। এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যেই ব্যাংকটির এসএমএ হিসাবে আরও ৭ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা জমা রয়েছে, যেটি খেলাপির পূর্ণ ঝুঁকিতে রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসএমএ ঋণ রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির। এই ব্যাংকের স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টে থাকা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাবে বিতরণ করা বড় ঋণগুলোর কিস্তি আদায় পুরোপুরি থমকে যাওয়ায় এই অর্থের বড় অংশই এখন মন্দ ঋণে রূপ নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৩৯.৬ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে কম খেলাপি ঋণ থাকা ডাচ-বাংলা ব্যাংকও এখন বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্যাংকটির এসএমএ অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে আছে ৬ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ একধাক্কায় তিন গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। মাত্র ১৫ মাসে ব্যাংকটির এসএমএতে থাকা ঋণের বকেয়া কিস্তির পরিমাণ ২২৮ শতাংশ বেড়ে গেছে।
শরিয়াহভিত্তিক আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে এসএমএ ঋণের বকেয়া কিস্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা, যার বড় অংশই তাদের শীর্ষ গ্রাহকদের খেলাপি হওয়ার আগাম আভাস দিচ্ছে। এস আলম পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অলৌকিকভাবে পুরো নিঃস্ব হওয়া থেকে বেঁচে যাওয়া এই ব্যাংকটির প্রকাশ্য খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৭.৭৮ শতাংশ। তবে এসএমএ ঋণ যদি দ্রুত নিয়মিত না হয়, তাহলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ডা. এইচবিএম ইকবালের লুটপাটে দুর্বল হয়ে পড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৩৫.৬২ শতাংশ বা ১১ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকার ঋণ ইতিমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে। এর বাইরে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এসএমএ ঋণ রয়েছে আরও ৫ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। এর ফলে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের অর্ধেকই এখন সরাসরি খেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংকের ৫ হাজার ১৪৩ কোটি, পূবালী ব্যাংকের ৪ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ৩ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৩ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার ঋণ উচ্চ ঝুঁকির এ হিসাবে রয়েছে।
তবে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কেবল নতুন খেলাপি ঋণের সম্ভাবনা নয়; বরং বিদ্যমান খেলাপি ঋণের গুণগত মানও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ।
মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক ঋণ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের প্রায় ৯৩.৭ শতাংশই এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ডে এটি একটি গুরুতর সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়।
খেলাপি ঋণের এই অবনতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর প্রভিশনিং সক্ষমতার ওপর। বিধি অনুযায়ী মন্দ ঋণের বিপরীতে উচ্চমাত্রার প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ দুর্বল ব্যাংক পর্যাপ্ত মুনাফা অর্জন করতে না পারায় প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারছে না। ফলে মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। তিন মাস আগে এ ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। মাত্র এক প্রান্তিকে ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকার বেশি।
সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি এখন দ্বিমুখী। একদিকে প্রকাশ্য খেলাপি ঋণের বড় অংশ আদায়-অযোগ্য মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকার এসএমএ ঋণ ভবিষ্যৎ খেলাপি ঋণের নতুন চাপ তৈরি করছে। ফলে আগামী কয়েকটি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মূলধন, প্রভিশন এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
বছরের পর বছর ধরে ভুল নীতি, ভুয়া নথিতে ঋণ বিতরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবে খেলাপিদের দেওয়া বিশেষ ছাড়ের কারণেই আজ ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা এভাবে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসাইন খান ডিএসজেকে বলেন, যেসব ঋণের কিস্তি সময়মতো আসে না, সেসব ঋণ এসএমএতে যোগ হয়। তবে এটা ঠিক যে, এই ঋণগুলো ভবিষ্যৎ খেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে যাতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।













