ব্যাংক খাতের পর এবার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ কমানো, আটকে থাকা ঋণ পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে একসঙ্গে দুটি বিশেষ নীতিগত সহায়তা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ব্যবস্থায় একদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের মতো ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সুবিধা দিতে পারবে, অন্যদিকে এককালীন সমঝোতার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ‘এক্সিট পলিসি’ বাস্তবায়নের সুযোগও পাবে।
বৃহস্পতিবার ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট (এফসিআরপিডি) থেকে জারি করা পৃথক দুটি সার্কুলারে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ৪১ ধারার আওতায় জারি করা এ নির্দেশনা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, আর্থিক সংকটে পড়লেও যেসব শিল্প, ব্যবসা বা প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে, সেগুলোকে পুনরায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আটকে থাকা ঋণ পুনরুদ্ধার সহজ করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করাও লক্ষ্য।
নতুন নীতিমালার আওতায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের যোগ্য ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুবিধা দিতে পারবে। এ সুবিধা ব্যাংকিং খাতে আগে থেকেই চালু থাকা পুনর্গঠন নীতিমালার আদলে প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে।
একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য চালু করা বিশেষ এক্সিট পলিসিতে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতারা এককালীন সমঝোতার মাধ্যমে দায় পরিশোধের সুযোগ পাবেন। তবে এ সুবিধা নিতে হলে ঋণগ্রহীতাকে বকেয়া মূলধনের শতভাগ পরিশোধ করতে হবে। কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান মূলধনের কোনো অংশ মওকুফ করতে পারবে না। তবে প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় জমাকৃত সুদের পুরোটা বা অংশবিশেষ মওকুফের সুযোগ থাকবে।
সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণও আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিটি প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগকে পর্যালোচনা করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন বিভাগের (এইচআইসিসি) মতামতের ভিত্তিতে অনুমোদন দিতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থের ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) আদায়-সংক্রান্ত শর্তেও সীমিত শিথিলতা দেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ‘মন্দ’ বা ‘লোকসান’ শ্রেণিভুক্ত ঋণ এবং ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পুনঃতফসিল হওয়া ঋণও এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আসবে। তবে অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, প্রতারণা বা অন্য কোনো অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণ এ সুবিধা পাবে না। এক্সিট পলিসিটি ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ এবং কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের ঋণ নিষ্পত্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি যোগ্য গ্রাহকদের চিঠি ও অন্যান্য উপযুক্ত যোগাযোগমাধ্যমে এ সুবিধার বিষয়ে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, দুটি নীতিমালার সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের চাপ কমবে, আটকে থাকা অর্থ পুনরুদ্ধার সহজ হবে, তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে কার্যক্রম শুরু করতে পারলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।













