দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে ১৮ মাসের একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পরিকল্পনার আওতায় একদিকে বিশেষ ‘এক্সিট পলিসি’ চালু করা হয়েছে, অন্যদিকে খেলাপি ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট থেকে মন্দ ঋণ সরিয়ে নিতে দুটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনিয়মে জড়িত ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবার নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণের সমস্যা আড়াল করা হয়েছে। এখন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত ঋণ নিষ্পত্তি এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, কর্মপরিকল্পনার প্রথম ধাপে ছয় মাসের জন্য ‘বুলেট পেমেন্ট এক্সিট পলিসি’ চালু করা হয়েছে। যেসব ব্যবসা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় কিংবা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা সীমিত, সেসব ঋণ বছরের পর বছর পুনঃতফসিল না করে এককালীন নিষ্পত্তির মাধ্যমে হিসাব বন্ধ করার সুযোগ থাকবে। গভর্নরের ভাষায়, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ইউক্রেন ও তুরস্কেও এ ধরনের নীতি কার্যকর হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ২০২৭ সালের মধ্যে ব্যাংকিং খাতের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে দুটি নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে। এর একটি মানি লোন কোর্ট (সংশোধিত) আইন, যার মাধ্যমে অর্থঋণ আদালতের মামলা সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। অন্যটি ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন, যার আওতায় একটি পৃথক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন করা হবে। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণ বা ‘টক্সিক অ্যাসেট’ কিনে নিয়ে সেগুলো পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব পালন করবে, ফলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটের ওপর চাপ কমবে।
গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তদারকি বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৩ থেকে ২৫ জুন ছয়টি ব্যাংকে তথ্যপ্রযুক্তি ও বৈদেশিক মুদ্রা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ নিরীক্ষা চালানো হয়েছে।
এই নিরীক্ষায় গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, ২০১৫ সালের কিছু এলসি দায় গ্রাহকের হিসাবে না দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ আড়াল করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক চাহিদা ও জোগান—উভয় দিক বিবেচনায় রেখে কাজ করছে। বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। তবে উৎপাদন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য শিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি চালু রয়েছে। এসব তহবিল থেকে ৪ থেকে ৬ শতাংশ ভর্তুকিযুক্ত সুদে ঋণ দেওয়া হবে, যা উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে তিনি স্বীকার করেন, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহব্যবস্থার সংস্কারেও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়েও ইতিবাচক মূল্যায়ন তুলে ধরেন গভর্নর। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে বিনিময় হার নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। স্থানীয় বাজারে ঋণের সুদহার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তাদের স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে উৎসাহিত করতে শিগগিরই নতুন নির্দেশনা জারি করা হবে।
ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন সম্প্রসারণে ‘বাংলা কিউআর’ সারা দেশে চালুর উদ্যোগের কথাও জানান গভর্নর। তাঁর মতে, এই প্ল্যাটফর্ম কার্যকর হলে নগদ লেনদেন কমবে, আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কর ফাঁকি কমিয়ে রাজস্ব আহরণও সহজ হবে।
দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলোর ঋণের জটিলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপডেট দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
গভর্নর জানান, এক্সচেঞ্জ রেট বা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে সিটি গ্রুপের ২৯টি ব্যাংকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার দায়দেনা তৈরি হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে ৩টি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩ মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে একটি টেকসই ও সমন্বিত সমাধান বাস্তবায়িত হলে গ্রুপটি এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া, ২০২২ সালে কারেন্সি ডেপ্রিসিয়েশন বা টাকার অবমূল্যায়নকালীন মেঘনা গ্রুপের ৮০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ প্রস্তাব বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি জানান, ওই ডলারের একটি অংশ লোকাল কারেন্সির (স্থানীয় মুদ্রা) ঋণ পরিশোধে ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকায় তা বাতিল করা হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে ইসলামী ব্যাংকিং ধারার ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সর্বশেষ ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন গভর্নর। তিনি জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি ও চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পর নতুন এমডি নিয়োগের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় প্রার্থী বাছাই, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এর ডকুমেন্টেশন এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিলিয়ে প্রক্রিয়াটিতে কিছুটা সময় লাগলেও, গত পরশু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এর চূড়ান্ত অনুমোদন (ক্লিয়ারেন্স) দেওয়া হয়েছে।
তারল্য সংকট প্রসঙ্গে গভর্নর উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে ৫১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান নতুন ম্যানেজমেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৪ মাসে কোনো ইসলামী ব্যাংককে নতুন করে কোনো তারল্য সহায়তা দিতে হয়নি। এটিকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক এবং স্বস্তির লক্ষণ হিসেবে অবিহিত করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।













