খুলনায় কোন শিল্পে বিনিয়োগ? তার ‘রোডম্যাপ’ খুঁজছে বিডা

DSJ Web Photo July 16 2026 Investment
ডিএসজে কোলাজ

খুলনা বিভাগে কোন কোন খাতে নতুন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব, বিনিয়োগকারীরা কোথায় সবচেয়ে বেশি বাধার মুখে পড়ছেন এবং কী ধরনের নীতিগত সংস্কার করলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠপর্যায়ে শিল্প জরিপ শুরু করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এই জরিপের তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে সরকারের শিল্পনীতি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং অঞ্চলভিত্তিক শিল্প উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি হবে।

এই লক্ষ্যেই বৃহস্পতিবার খুলনায় ‘সার্ভে অব ইন্ডাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিভাগীয় কর্মশালার আয়োজন করে বিডা। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়ন করছে এবং কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। কর্মশালায় সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও গবেষকরা খুলনা অঞ্চলের শিল্প সম্ভাবনা, বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত মতামত দেন।

কর্মশালায় জানানো হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে একযোগে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগ সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যভান্ডারের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারণ হচ্ছে খণ্ডিত তথ্যের ভিত্তিতে। নতুন এই শিল্প জরিপের মাধ্যমে সেই ঘাটতি দূর করে একটি জাতীয় বিনিয়োগ ডেটাবেজ তৈরি করা হবে, যা বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, দেশে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিচ্ছিন্নভাবে রয়েছে। একই তথ্য একাধিকবার সংগ্রহ করা হচ্ছে, কিন্তু কোথাও সমন্বিত চিত্র নেই। এই জরিপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ তৈরি এবং প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়নের ভিত্তি গড়ে তোলা হবে।

তিনি জানান, জরিপের আওতায় দেশের সব প্রশাসনিক বিভাগ, প্রধান অর্থনৈতিক খাত, বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং মালিকানার ধরন অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সংগৃহীত তথ্য যাচাই শেষে বিনিয়োগ বিশ্লেষণ, নীতিপত্র এবং একটি জাতীয় বিনিয়োগ সংকলনও প্রকাশ করা হবে।

বিডার মহাপরিচালক গাজী এ কে এম ফজলুল হক বলেন, সরকার অনেক সময় সীমিত বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এই জরিপের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত শিল্পচিত্র, বিনিয়োগকারীর সংখ্যা, খাতভিত্তিক সক্ষমতা এবং সমস্যাগুলোর বাস্তব চিত্র উঠে আসবে। ফলে ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যনির্ভর হবে।

তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের আগে দেশীয় বিনিয়োগকে শক্তিশালী করা জরুরি। স্থানীয় উদ্যোক্তারা সন্তুষ্ট থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে। এ কারণে খুলনায় কোন কোন শিল্প গড়ে উঠতে পারে, সে বিষয়ে অংশীজনদের মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে।

কর্মশালায় খুলনা অঞ্চলের সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে পাট, চিনি, জাহাজ নির্মাণ, হিমাগার, সামুদ্রিক শৈবাল, মুক্তা, নারকেল ও নারকেলজাত পণ্য, মাশরুম, টমেটো, আম, পানসহ কৃষি ও সামুদ্রিক সম্পদভিত্তিক শিল্পের কথা উঠে আসে। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

আচিয়া সি ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল ইসলাম জহির বলেন, খুলনায় শিল্পের সম্ভাবনা অনেক হলেও আধুনিক প্রযুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে অঞ্চলটি দেশের অন্যতম শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

প্রধান অতিথি খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার সিফাত মেহনাজ বলেন, শিল্প উন্নয়নের সহায়তা শুধু বিভাগীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে জেলা পর্যায়েও সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমির দক্ষ ব্যবহার, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং উন্নত কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে কৃষিভিত্তিক শিল্পে বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এডিবির পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট তাসনিম আলম বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পথে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বেসরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা আরও বাড়াতে হবে। এজন্য বিনিয়োগকারীদের প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

উন্মুক্ত আলোচনায় উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ ঘাটতি, উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ, লাইসেন্স জটিলতা, পর্যাপ্ত চলতি মূলধনের অভাব, জামানত সমস্যা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার ঘাটতিকে নতুন বিনিয়োগের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তারা বলেন, এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে খুলনায় শিল্পায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

বিডা জানিয়েছে, আটটি বিভাগেই এ ধরনের কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্প সম্ভাবনা ও বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি সমন্বিত জাতীয় শিল্প ও বিনিয়োগ মানচিত্র তৈরি করা হবে, যা ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রমাণভিত্তিক শিল্পনীতি প্রণয়নে ব্যবহার করা হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top