কারসাজির ফাঁদে এবার কারসাজিকারীরাই

Web Photo Card July 11 2026 Tea
ডিএসজে

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজির অভিযোগ নতুন নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উচ্চ দামে শেয়ার কিনতে প্রলুব্ধ করা হয়, আর লাভ নিয়ে বেরিয়ে যায় কারসাজিকারীরা। কিন্তু ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের (এনটিসি) ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত কারসাজিতে অভিযুক্তদের জন্যই কোটি কোটি টাকার ক্ষতির কারণ হয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট থেকে ১২ সেপ্টেম্বর—মাত্র ১৮ কার্যদিবসে এনটিসির শেয়ারের দাম ২৭০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে ৪৮৬ টাকা ৯০ পয়সায় পৌঁছে যায়, যা প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি। কিন্তু বাজারে সেই কৃত্রিম মূল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৩ অক্টোবর থেকেই শুরু হয় দরপতন। পরবর্তী দেড় মাসেরও কম সময়ে সর্বোচ্চ দর থেকে শেয়ারটির মূল্য প্রায় ৬১ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৮৯ টাকা ৯০ পয়সায়। তদন্ত অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত দুই পক্ষের মোট (রিয়েলাইজড ও আনরিয়েলাইজড) লোকসান দাঁড়ায় ৩৬ কোটি টাকারও বেশি।

পুরো মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাটি এমন একটি কোম্পানিকে কেন্দ্র করে, যার মৌলিক আর্থিক ভিত্তি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। রাষ্ট্রায়ত্ত এনটিসির মালিকানায় রয়েছে সিলেট অঞ্চলের ১৩টি চা-বাগান, কিন্তু কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরেই লোকসানে। স্বল্প মূলধনী এই কোম্পানিটি সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০৪ কোটি টাকার বেশি নিট লোকসান করেছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৫৮ টাকা ৫৩ পয়সা, নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) নেমে গেছে ঋণাত্মক ১৪৪ টাকা ৯৭ পয়সায় এবং পরিচালন কার্যক্রম থেকেও নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক।

উদ্বেগজনক তথ্য হলো, কোম্পানিটির প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় হয় প্রায় ২৬০ টাকা, অথচ বিক্রি করতে হয় গড়ে ১৩২ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি চা বিক্রিতেই লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

তারপরও ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এনটিসির শেয়ার ঘিরে বাজারে অস্বাভাবিক ক্রয়চাপ তৈরি হতে শুরু করে। এমন একটি কোম্পানির শেয়ারের দর কয়েক সপ্তাহে ৮০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে—বাজার কি সত্যিই কোম্পানির ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করছিল, নাকি পরিকল্পিতভাবে সেই চাহিদার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তে নামে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

তদন্ত কমিটি ট্রেডের সময়, অর্ডার প্যাটার্ন, হাওলা, ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক এবং বিভিন্ন হিসাবের সংযোগ বিশ্লেষণ করে। সেই বিশ্লেষণে উঠে আসে, এটি বিচ্ছিন্ন কয়েকজন বিনিয়োগকারীর স্বাভাবিক লেনদেন ছিল না; বরং একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে পরিচালিত একটি সমন্বিত ট্রেডিং প্যাটার্ন।

তদন্তে মো. সরওয়ার কামালকে এই কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে ইরাম কামাল, নিলুফার কামাল, ম্যাকডোনাল্ড বাংলাদেশ (প্রাইভেট) লিমিটেড এবং ম্যাকড্রাই ডেসিক্যান্ট লিমিটেডের হিসাবগুলোর লেনদেনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া গেছে।

তদন্ত অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট থেকে ৭ অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে এই গোষ্ঠী মোট ৫ লাখ ১ হাজার ৯৫টি শেয়ার কেনে। শুধু সরওয়ার কামাল একাই কেনেন ৩ লাখ ৭ হাজার ৫০৫টি শেয়ার, যা আলোচ্য সময়ে লেনদেন হওয়া মোট শেয়ারের প্রায় ৪৭ শতাংশ। তদন্তে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলো মিলিয়ে ওই সময়ে এনটিসির মোট লেনদেন হওয়া শেয়ারের প্রায় ৯০ শতাংশের ওপর তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল।

এই সমন্বিত লেনদেনের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় ৫, ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বরের ট্রেডিংয়ে।

৫ সেপ্টেম্বর, সকাল ১১টা ৮ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড থেকে ১১টা ১৮ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড পর্যন্ত মাত্র ১০ মিনিটে বাজারে লেনদেন হওয়া শেয়ারের ৯৮.২০ শতাংশ, কিনে নেয় একই গোষ্ঠী। এতে শেয়ারটির দাম ৩১০ টাকা থেকে বেড়ে ৩১৩ টাকা ৪০ পয়সায় ওঠে এবং দিন শেষে সমাপনী দর দাঁড়ায় ৩২০ টাকা ৩০ পয়সা।

৯ সেপ্টেম্বর মোট লেনদেন হওয়া ১৬ হাজার ২২৬টি শেয়ারের মধ্যে ৫২.৬৯ শতাংশ একই গোষ্ঠী কিনে নেয়। দিনের একটি পর্যায়ে লেনদেন হওয়া শেয়ারের ৯৪.৮২ শতাংশও তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেদিন সমাপনী দর বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭৮ টাকা ৭০ পয়সা। ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র ৩৫ সেকেন্ডে বাজারে লেনদেন হওয়া শেয়ারের প্রায় ৮৫ শতাংশ একই গোষ্ঠী কিনে নেয়। টানা এই ক্রয়চাপের ধারাবাহিকতায় ১২ সেপ্টেম্বর এনটিসির শেয়ার সর্বোচ্চ ৪৮৬ টাকা ৯০ পয়সায় ওঠে।

তদন্তে ইকুইটি রিসোর্সেস লিমিটেডের ভূমিকাও উঠে এসেছে। তদন্ত অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর এনটিসির মোট শেয়ার ক্রয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই কিনেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি মোহাম্মদ বিন কাশেম শেয়ার কেনার সময় এনটিসির পরিচালক ছিলেন কি না, তা নিয়ে তদন্তে আলোচনা রয়েছে। এনটিসির কোম্পানি সচিব এ কে আজাদ চৌধুরী ডিএসজেকে বলেন, মোহাম্মদ বিন কাশেম ২০২৪ সালের অক্টোবরে পরিচালক হিসেবে যোগ দেন, যদিও নির্দিষ্ট তারিখ তিনি জানাতে পারেননি।

তবে মোহাম্মদ বিন কাশেম তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য প্রত্যাখ্যান করে ডিএসজেকে বলেন, “আমি কিংবা ইকুইটি রিসোর্সেস লিমিটেড ওই সময়ে এনটিসির কোনো শেয়ার কিনিনি। আমি কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গেও জড়িত নই। তদন্ত প্রতিবেদনে ভুল তথ্য রয়েছে।”

তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূল্যবৃদ্ধির পুরো প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত দুই পক্ষের কাছেই আগে থেকেই উচ্চ মূল্যে কেনা বিপুল পরিমাণ এনটিসির শেয়ার ছিল। অর্থাৎ তাদের লক্ষ্য শুধু নতুন শেয়ার কেনা নয়, বিদ্যমান বিনিয়োগের বাজারমূল্যও কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখা।

তদন্ত অনুযায়ী, সরওয়ার কামাল ও তাঁর সহযোগীদের কাছে কারসাজি শুরুর আগেই ৩ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি শেয়ার ছিল, যেগুলোর গড় ক্রয়মূল্য প্রায় ৬০৩ টাকা। পরে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে তারা আরও ৫ লাখ ১ হাজার ৯৫টি শেয়ার কেনে। কিছু শেয়ার বিক্রির পরও ৩ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের হাতে ছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার ১৭০টি শেয়ার, যার গড় ক্রয়মূল্য ছিল ৪০১ টাকা ১১ পয়সা।

কিন্তু বাজার তাদের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। এক বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করে ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে তারা লোকসানে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৭১৮টি শেয়ার বিক্রি করে। যেসব শেয়ারের গড় ক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৪৬৫ টাকা, সেগুলো বিক্রি করতে হয়েছে গড়ে প্রায় ৪২ শতাংশ কম দামে। এতে তাদের নগদ (রিয়েলাইজড) লোকসান হয় ৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। বিক্রির পরও হাতে থাকা শেয়ারের বিপরীতে কাগুজে (আনরিয়েলাইজড) ক্ষতি ছিল আরও ১০ কোটি ১৬ লাখ টাকার বেশি।

অন্যদিকে, তদন্ত নথি অনুযায়ী ইকুইটি রিসোর্সেস লিমিটেডের হাতে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার ২৬৭টি শেয়ার, যার গড় ক্রয়মূল্য ৭২৮ টাকা ৭০ পয়সা। পরবর্তী সময়ে শেয়ারদর ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আনরিয়েলাইজড লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ২০ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

অর্থাৎ শুধু এই দুই পক্ষের বাস্তবায়িত ও অবাস্তবায়িত সম্মিলিত ক্ষতিই ৩৬ কোটি টাকার বেশি। তবে এই হিসাবও এখন পুরোনো। কারণ তদন্ত শেষ হওয়ার পরও এনটিসির শেয়ারদর আর ঘুরে দাঁড়ায়নি। ২০২৬ সালের ৯ জুলাই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিটির সমাপনী দর ছিল ১৬৬ টাকা ৭০ পয়সা। ফলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যদি এখনও শেয়ার ধরে রেখে থাকে, তাহলে তাদের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত অঙ্কের চেয়েও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এই তদন্তের তাৎপর্য শুধু লোকসানের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। তদন্ত কমিটির মতে, একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত হিসাব থেকে ধারাবাহিকভাবে এমনভাবে ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে বাজারে শেয়ারটির লেনদেন ও দাম স্বাভাবিকভাবে বাড়ছে—এমন ধারণা সৃষ্টি হয়। এ ধরনের লেনদেন অন্য বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে এবং বাজারের স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে বিকৃত করতে পারে।

এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে মত দিয়েছে, ঘটনাটি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ধারা ১৭(ই)(ভি) লঙ্ঘনের মধ্যে পড়তে পারে। ওই ধারায় এমন লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য বাজারে কৃত্রিম লেনদেন বা মূল্যবৃদ্ধির ধারণা সৃষ্টি করা।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজেকে বলেন, “শেয়ার লেনদেনে কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লোকসানে থাকলেও আইনি দায় থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ নেই।”

এনটিসির ঘটনাটি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। দুর্বল মৌলভিত্তির একটি কোম্পানির শেয়ারদর সমন্বিত লেনদেনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে বাড়ানো সম্ভব হলেও সেই মূল্য দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রাখা যায় না। শেষ পর্যন্ত বাজার ফিরে আসে কোম্পানির প্রকৃত আয়, সম্পদ, নগদ প্রবাহ ও ব্যবসায়িক সক্ষমতার কাছেই। এছাড়া আধুনিক ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থায় প্রতিটি অর্ডার, সময়চিহ্ন ও লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে সমন্বিত ট্রেডিং শনাক্ত করা সম্ভব।

ন্যাশনাল টি কোম্পানির সাত সপ্তাহের এই ঘটনাপ্রবাহ তাই শুধু একটি ব্যর্থ কারসাজির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি সতর্কবার্তাও। বাজারকে কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্ত করা সম্ভব হলেও মৌলিক বাস্তবতাকে দীর্ঘদিন পরাজিত করা যায় না। কৃত্রিম চাহিদা সাময়িকভাবে মূল্য বাড়াতে পারে, কিন্তু স্থায়ী মূল্য সৃষ্টি করতে পারে না।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top