বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। এমন সময়ে দেশের কোন অঞ্চলে কী ধরনের শিল্প গড়ে উঠতে পারে, কোথায় বিনিয়োগের সবচেয়ে বেশি সুযোগ এবং কী কী বাধা শিল্পায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে—তার একটি বাস্তবভিত্তিক চিত্র তৈরি করতে মাঠপর্যায়ে শিল্প জরিপ শুরু করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এবার বরিশাল বিভাগকে বেছে নিয়েছে সংস্থাটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি, মৎস্য, নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ, পর্যটন এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বরিশাল এখনও দেশের শিল্প মানচিত্রে প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক শিল্পনীতি প্রণয়নই বিডার নতুন জরিপের মূল লক্ষ্য।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) যৌথভাবে বুধবার (১৫ জুলাই) বরিশালের হোটেল গ্র্যান্ড পার্কে ‘সার্ভে অব ইন্ডাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিভাগীয় কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালায় বিডা, জেলা প্রশাসন, চেম্বার অব কমার্স, উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের শিল্পায়ন নিয়ে নির্ভুল তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। কোন অঞ্চলে কোন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেশি এবং উদ্যোক্তারা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা চিহ্নিত করতেই এই জরিপ পরিচালিত হচ্ছে। জরিপের তথ্য ভবিষ্যতে শিল্পনীতি প্রণয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এডিবির ইকোনমিকস অফিসার মো. রবিউল ইসলাম রবি ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বলেন, এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে আঞ্চলিক শিল্প সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি দক্ষ জনশক্তি, উন্নত লজিস্টিকস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি এবাদুল হক চাঁদ বলেন, বরিশালের অর্থনীতি মূলত কৃষি ও মৎস্যনির্ভর। শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য মাছ, কৃষিপণ্য এবং সেগুলোর প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে পারলে এই অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে।
বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, নদীবেষ্টিত ভৌগোলিক অবস্থান, কৃষি উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে বরিশালে বড় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ নীল বলেন, বরিশালে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, লবণাক্ত ও মিঠা পানির সমন্বিত ব্যবহার এবং নতুন শিল্প উদ্যোগের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের অভাবে এসব সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সভাপতির বক্তব্যে বিডার মহাপরিচালক গাজী একেএম ফজলুল হক বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে শিল্পায়নের নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বরিশালসহ যেসব অঞ্চলে শিল্পের বিকাশ তুলনামূলক কম, সেখানে দেশীয় ও বিদেশি—উভয় ধরনের বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে।
কারিগরি অধিবেশনে সানেমের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জুবায়ের হোসেন শিল্প জরিপের পদ্ধতি, সময়সূচি ও তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই জরিপের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান, উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা এবং অবকাঠামোগত চাহিদার একটি জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বরিশালে ওষুধ শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরিষাভিত্তিক শিল্প, নারকেল ও নারকেলজাত পণ্য, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত পোলট্রি, জৈব সার, মহিষের দই শিল্প এবং কুয়াকাটা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের পর্যটন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে কোল্ড স্টোরেজ, লজিস্টিকস, বিদ্যুৎ, দক্ষ জনবল এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন তারা।
বিডা সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভাগভিত্তিক এই শিল্প জরিপ শেষ হলে দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই নতুন শিল্পনীতি, বিনিয়োগ প্রণোদনা এবং অঞ্চলভিত্তিক শিল্প উন্নয়নের কৌশল নির্ধারণ করা হবে।













