কেনো কঠোর মুদ্রানীতি বহাল রাখছে বাংলাদেশ ব্যাংক?

Web Photo Card June 8 2026 BB GOV
ডিএসজে কোলাজ

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে টানা তৃতীয় দফার মতো কঠোর মুদ্রানীতি বহাল রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগে দ্রুত গতি ফেরার আশা আরও ক্ষীণ করে তুলেছে। যদিও সরকার প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বড় বাজেট ও প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

একই সঙ্গে বড় বাজেট, প্রণোদনা কর্মসূচি, তারল্য সহায়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার কার্যক্রম অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ সৃষ্টি করছে। এর ফলে বাজারে অর্থের সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকেরা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আগামীকাল বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের মুদ্রানীতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই নতুন মুদ্রানীতির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নীতি সুদহার আগের অবস্থানেই রাখা হচ্ছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে সরকার গড় মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। টানা দুই মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় এর নেতিবাচক চাপ অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই বিস্তৃত হয়েছে।

মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৭১ শতাংশ। গ্রাম ও শহর—উভয় এলাকাতেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর তীব্র আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

এদিকে নতুন অর্থবছরের বড় বাজেট এবং প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচির কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বাজারে চাহিদা ও অর্থপ্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার কমিয়ে আরও সম্প্রসারণমূলক অবস্থানে যাওয়া সমীচীন হবে না। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সতর্ক বা ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করতে পারে।

অন্যদিকে পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তবে শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এটি সম্ভব নয়, করব্যবস্থা, রাজস্বনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনাতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি মনে করেন, দেশে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায় ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে পড়ে। নীতি সুদহার ১ শতাংশ কমিয়ে ৯ শতাংশে আনা হলে বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগে গতি ফিরতে পারে বলে তিনি পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরোপুরি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে যায় এবং নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।

নতুন মুদ্রানীতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি জানান, অর্থবছর শুরুর আগেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং স্বীকার করেন যে, নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top