কঠোর মুদ্রানীতি বহাল, সুদহার কমার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ

ডিএসজে

উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি না কমায় টানা তৃতীয় দফার মতো কঠোর মুদ্রানীতিই বহাল রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। ফলে স্বল্পমেয়াদে সুদহার কমে ঋণ ও বিনিয়োগে গতি ফেরার সম্ভাবনাও সীমিত থাকছে।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মো. মোস্তাকুর রহমান নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। ঘোষিত নীতিতে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) সুদহার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) সুদহার ৭ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত দুই বছরে অনুসৃত কঠোর মুদ্রানীতির ফলে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছালেও ২০২৬ সালের মে মাসে তা কমে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। তবে এই হার এখনও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে না আসায় সংকোচনমূলক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, দেশের অর্থনীতি এখনও একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক ঝুঁকির মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীরগতির বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়িয়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের দুর্বল চিত্রও উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৫ শতাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, উচ্চ সুদহার, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফলে শিল্প ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না।

তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমন্বিতভাবে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। শিল্প, কৃষি এবং ক্ষুদ্র, কুটির, মাঝারি ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য এই তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এর মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং উৎপাদনমুখী খাতে নতুন গতি ফিরবে।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে নতুন মুদ্রানীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমানো, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ব্যাংক আইন বাস্তবায়ন এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন সম্প্রসারণে ‘বাংলা কিউআর’কে জাতীয় সমন্বিত পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, সরকারের সম্প্রসারণমূলক বাজেট, লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ কর্মসূচি এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ফলে আগামী মাসগুলোতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতির স্থায়ী চাপ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক খাতের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠাই আগামী সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top