রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির নিয়ন্ত্রণে ফিরছে এস আলম ঘনিষ্ঠ চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী কেডিএস গ্রুপ। বুধবার (১৫ জুলাই) ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ও ৪৭(৩) ধারার ক্ষমতাবলে ব্যাংকটির নতুন ১৪ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই পর্ষদে কেডিএস গ্রুপের পাঁচজন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যাংকটিতে তাদের করপোরেট প্রভাব আবারও দৃশ্যমান হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কেডিএস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা খলিলুর রহমান এবং তাঁর ছেলে সেলিম রহমান পরিচালক হিসেবে পর্ষদে ফিরেছেন। এছাড়া কেডিএস গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, কেডিএস টেক্সটাইলস মিলস লিমিটেড এবং কে. ওয়াই. স্টিল মিলস লিমিটেডের পক্ষে যথাক্রমে মাহবুব আহমেদ, ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকিং খাতে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন পর্ষদ ভেঙে দেয়। সে সময় এস আলম গ্রুপ ও কেডিএস গ্রুপ—উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের সরিয়ে দিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও শেয়ারহোল্ডার প্রতিনিধিদের ফিরিয়ে এনে নতুন পর্ষদ গঠন করল। মূলত সাবেক পরিচালকদের একটি বড় অংশকেই আবারও ফিরিয়ে আনা হয়েছে নতুন পর্ষদে।
কেডিএস গ্রুপ ছাড়াও নতুন পর্ষদে যেসব পরিচালক স্থান পেয়েছেন, তাঁরা হলেন— বদিউর রহমান, আলহাজ্ব আহামেদুল হক, মোহাম্মদ ইমাদুর রহমান, নাজমুল আহসান খালেদ, লিয়াকত আলী চৌধুরী, মো. রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ আবদুস সালাম, মো. এনায়াত উল্লা ও আনোয়ার হোসাইন। এই পরিচালকদের প্রায় সবাই ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন। এদের মধ্যে আনোয়ার হোসাইন ও মো. এনায়াত উল্লা ব্যাংকটির উদ্যোক্তা ছিলেন।
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত শরিয়াহভিত্তিক আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার, যা মোট ঋণের ১৭.৭৮ শতাংশ। তবে খেলাপির ঝুঁকিতে বা ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট’ (এসএমএ) এ ঋণের বকেয়া কিস্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা, যার বড় অংশই তাদের শীর্ষ গ্রাহকদের খেলাপি হওয়ার আগাম আভাস দিচ্ছে। এসএমএ ঋণ যদি দ্রুত নিয়মিত না হয়, তাহলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ও করপোরেট মালিকানা মিলিয়ে কেডিএস গ্রুপের হাতে ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার। ওই বছর ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন সেলিম রহমান।ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, নতুন পর্ষদে দুজন উদ্যোক্তা-পরিচালক এবং তিনজন করপোরেট প্রতিনিধি পরিচালক যুক্ত হওয়ায় ১৪ সদস্যের বোর্ডে কেডিএস গ্রুপের সরাসরি পাঁচটি আসন নিশ্চিত হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকটির নীতিনির্ধারণে গ্রুপটির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করেছে। ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৩(১)(ক) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি একই সময়ে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির পরিচালক থাকতে পারেন না। বর্তমানে তিনি প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এবং প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদে অধিষ্ঠিত থাকায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব কার্যকরভাবে গ্রহণের আগে তাঁকে ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে এবং বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে।
এর আগে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপ ও কেডিএস গ্রুপের যৌথ প্রভাবাধীন ছিল। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই গ্রুপের সম্মিলিত শেয়ার ধারণ ছিল প্রায় ৩৭ শতাংশের বেশি। তবে নতুন পর্ষদে এস আলম গ্রুপের কোনো প্রতিনিধি স্থান না পেলেও কেডিএস গ্রুপের প্রত্যাবর্তন ব্যাংকটির করপোরেট নিয়ন্ত্রণে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।













