স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। কমিটিটি ইতোমধ্যে তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)-এর কাছে পাঠিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সেমিনারে এ তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
মন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত সময় চাওয়ার উদ্দেশ্য এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়; বরং কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রস্তুতি প্রক্রিয়াকে পূর্ণতা দেওয়া। তাঁর ভাষায়, এই সময়কে সরকার প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করে একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক উত্তরণ নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহার করতে চায়।
বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) আয়োজিত সেমিনারে জানানো হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারে ২৫টি অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে ব্যবসা শুরু করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করে অনুমোদনের সময় ১৪ দিনে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, সরকার একই সঙ্গে একটি নাজুক অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজ করছে। এই প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন সহযোগীদের ধারাবাহিক সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মূল প্রবন্ধে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বাংলাদেশের সামনে থাকা অর্থনৈতিক ঝুঁকি, এলডিসি-পরবর্তী সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ এবং অতিরিক্ত সময় কাজে লাগাতে সরকারের সময়ভিত্তিক সংস্কার রোডম্যাপ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, রপ্তানি সক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া উত্তরণ-পরবর্তী সুবিধা ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ এবং উত্তরণ-পরবর্তী সময়েও বাজারসুবিধা ধরে রাখতে পারস্পরিক সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর (ভারপ্রাপ্ত) গীতাঞ্জলি সিং, সুইডেন, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান এবং বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনসহ সরকারি ও বেসরকারি খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আর্থিক খাতের সংস্কার, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন, যাতে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি টেকসই থাকে।













