এলডিসি উত্তরণে ৫ বছরের বাণিজ্য রোডম্যাপ

DSJ Web Photo July 19 2026 LDCGraduation
ছবি- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা, রপ্তানি সম্প্রসারণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়নে পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন কর্মপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে সরকার। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতাধীন ‘উন্নত সমন্বিত কাঠামো’ কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করা দেশীয় কর্মসূচি দলিল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত দেশীয় কর্মসূচি দলিলের যাচাই-বাছাই কর্মশালায় এ কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সরকারের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। একদিকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অশুল্ক বাধা, বৈশ্বিক মান ও নিয়ম মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের মতো চ্যালেঞ্জ একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, উন্নত সমন্বিত কাঠামো কর্মসূচির আগের দুই পর্যায়ে যেসব সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল, নতুন কর্মপরিকল্পনায় সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মোট ১২টি অগ্রাধিকার কর্মসূচি রাখা হয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশের বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাণিজ্য সচিবের ভাষায়, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন বা গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। তাই কোন সংস্কার কীভাবে কার্যকর হবে, তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে এবং মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত এর সুফল পৌঁছে দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য সহজীকরণ, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়ন, সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার সংস্কার এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন জানান, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এই কর্মসূচির মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইডেনসহ কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ এই কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে থাকে।

তিনি জানান, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এই কর্মসূচির প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। প্রথম পর্যায় ২০০৯ সালে শুরু হয়ে ২০১৫ সালে শেষ হয়। দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ২০১৬ সালে এবং ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। এখন তৃতীয় পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করা দেশীয় কর্মসূচি দলিলের ভিত্তিতে নতুন অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছর থেকেই পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও কর্মসূচির পরামর্শক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, নতুন কর্মপরিকল্পনা তৈরির সময় দেশের বিদ্যমান বাণিজ্য, শিল্প ও রপ্তানি নীতি, বাণিজ্য সংযুক্তি বিষয়ক মূল্যায়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তি এবং বিনিয়োগ সহজীকরণসংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি ও গবেষণার সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, শুরুতে প্রায় ৫২টি সম্ভাব্য প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে উন্নয়ন সহযোগীদের সম্ভাব্য অর্থায়ন, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং অগ্রাধিকার বিবেচনা করে সেগুলো থেকে ১২টি কর্মসূচি নির্বাচন করা হয়েছে। এই কর্মসূচিগুলোর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সহজীকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার সম্প্রসারণ।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের প্রতিনিধিরা মনে করেন, পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় থাকবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ আগামী সময়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা ধীরে ধীরে হারাবে। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নীতিগত সংস্কার, রপ্তানির বহুমুখীকরণ এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়ন এখন শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হয়ে উঠেছে। সরকারের নতুন এই পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনাকে তাই এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতির প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top