স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জি-৭৭ ও চীন জোট। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত পৃথক বৈঠকে দুই পক্ষই বাংলাদেশের মসৃণ, টেকসই ও অপরিবর্তনীয় উত্তরণ প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। ফলে ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়সীমার পরিবর্তে অতিরিক্ত প্রস্তুতি সময় পাওয়ার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অর্জন করেছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ইউরোপীয় ইউনিয়নের জাতিসংঘস্থ প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত স্টাভরোস ল্যামব্রিনিডিস এবং জি-৭৭ ও চীনের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং উরুগুয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, এলএফএমইএবির সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর এবং বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিস্তৃত কাঠামোগত পরিবর্তনের কাজ চলমান রয়েছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে সংস্কার কার্যক্রম আরও সুসংহত করা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা, শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং উত্তরণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব হবে।
তিনি বাংলাদেশ সরকারের চলমান সংস্কার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। এর মধ্যে সুশাসন জোরদার, আর্থিক খাতের সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরির পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য বলে জানান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি স্টাভরোস ল্যামব্রিনিডিস বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচি এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরুকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে ইইউর ধারাবাহিক সমর্থনের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে জি-৭৭ ও চীনের চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর আবেদনকে শক্তিশালী ও যৌক্তিক বলে অভিহিত করেন। তিনি বাংলাদেশের বাস্তবধর্মী সংস্কার কর্মসূচিকে স্বাগত জানান এবং জি-৭৭-এর পক্ষ থেকে সমর্থন অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কৌশল নিয়ে জি-৭৭ সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি বিশেষ ব্রিফিং আয়োজনের প্রস্তাব দেন, যা বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল স্বাগত জানায়।
বৈঠক শেষে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। ইইউ আবারও বাংলাদেশের মসৃণ, টেকসই ও অপরিবর্তনীয় এলডিসি উত্তরণে তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া ও কৃষিভিত্তিক পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় পাওয়া গেলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত থাকলেও সরকার সম্প্রতি জাতিসংঘের কাছে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে। সরকারের যুক্তি হলো, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক সংকট, জ্বালানি বাজারের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। নিউইয়র্কে ইইউ ও জি-৭৭-এর ইতিবাচক অবস্থান সেই প্রচেষ্টাকে নতুন গতি দিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।













