বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও সম্প্রসারণের পথে রয়েছে, কিন্তু সেই গতি আগের মতো নেই। জুন মাসে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অন্যতম সূচক পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, টানা দুই মাসের উন্নতির পর দেশের উৎপাদন খাত আবার সংকোচনে ফিরে গেছে। একই সঙ্গে নির্মাণ খাতও সম্প্রসারণ হারিয়ে আবার দুর্বল হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর, দুর্বল বাজার এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের চাপ অর্থনীতির গতি মন্থর করে দিচ্ছে।
মঙ্গলবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথভাবে প্রকাশিত জুন মাসের পিএমআই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মে মাসের তুলনায় সূচক ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৫২ দশমিক ৯-এ নেমে এসেছে। যদিও ৫০-এর ওপরে অবস্থান করায় অর্থনীতি এখনও সম্প্রসারণে রয়েছে, তবে প্রবৃদ্ধির গতি যে উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হয়েছে, সেটিই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে উৎপাদন খাতে। নতুন অর্ডার, নতুন রপ্তানি, কর্মসংস্থান, সরবরাহকারীদের সরবরাহ এবং অর্ডারের জট—প্রায় সব সূচকেই দুর্বলতা দেখা গেছে। যদিও উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয় ও আমদানি পুরোপুরি থেমে যায়নি, তবে সেখানেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে, যা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
নির্মাণ খাতেও একই চিত্র। মে মাসে সামান্য উন্নতির পর জুনে নতুন নির্মাণকাজ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক নির্মাণ কার্যক্রম আবার সংকুচিত হয়েছে। তবে নির্মাণ উপকরণের দাম এবং অসমাপ্ত কাজের পরিমাণ বেড়েছে, যা এই খাতের ব্যয়চাপ আরও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে কৃষি খাত টানা দশম মাসের মতো সম্প্রসারণে রয়েছে। তবে নতুন ব্যবসা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি আগের তুলনায় কমেছে। পরিষেবা খাতও টানা একুশতম মাস সম্প্রসারণ ধরে রেখেছে, যদিও নতুন কাজ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতিও মন্থর হয়েছে।
প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীরা অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, এলপিজি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, শ্রম ব্যয়, পরিচালন ব্যয় এবং নতুন ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক সংকট, চলমান সড়ক নির্মাণকাজ এবং দুর্বল বাজারও ব্যবসাকে চাপে রেখেছে। কৃষি উদ্যোক্তারা আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা ও মৌসুমি চাহিদা কমে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন।
তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে পুরোপুরি হতাশ নন উদ্যোক্তারা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি, পরিষেবা ও নির্মাণ খাত আগামী মাসগুলোতেও সম্প্রসারণে থাকতে পারে। উৎপাদন খাতও আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, জুন মাসের তথ্য অর্থনীতিতে সম্প্রসারণের ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিলেও বিভিন্ন খাতের মধ্যে বৈষম্য স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, দীর্ঘ ঈদুল আজহার ছুটি, বর্ষার শুরু এবং ঈদ-পূর্ব চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাবও জুন মাসের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে পড়েছে।













