করোনার কঠিন সময়ে দেওয়া প্রণোদনা ও বিশেষ প্যাকেজের টাকা ব্যবসায়ীরা যথাযথভাবে ফেরত দিচ্ছেন কি না—সেই হিসাব চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার সাধারণ মানুষের করের টাকা দিয়ে আসলে কী করছে এবং সেই টাকা খরচের জবাবদিহি কোথায়।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনে আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট গোলটেবিল আলোচনায় সরকারি প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী নেতাদের পাল্টাপাল্টি এমন অবস্থানে এক উত্তপ্ত কিন্তু গঠনমূলক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস আয়োজিত এই সংলাপে ড. তিতুমীর বলেন, “কোভিডকালীন যে প্রণোদনা ও স্টিমুলাস প্যাকেজ দেওয়া হয়েছিল, তার জবাবদিহি আমরা আশা করি। যে ব্যবসায়ীরা ওই সুবিধা নিয়েছিলেন, তাদের সেই টাকা সঠিকভাবে ফেরত দেওয়া উচিত।” তিনি এই বিষয়ে নিরীক্ষক বা অডিটরদের বিশেষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান এবং প্রশ্ন তোলেন যে, ব্যাংকিং খাতের বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ পেশাদারদের মাধ্যমে কীভাবে প্রত্যয়িত বা সার্টিফাইড হয়েছিল।
উপদেষ্টার এই বক্তব্যের বিপরীতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে করের টাকার হিসাব ও ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে জোরালো দাবি ওঠে। বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, “আপনি কর না পেলে ধরপাকড় করেন, জেলে দেন। কিন্তু আমার ট্যাক্সের টাকা নিয়ে আপনারা করেন কী? আপনারা যেভাবে আমাদের নাজেহাল করে কর আদায় করেন, সেই টাকা কীভাবে খরচ হয় তার জবাবদিহির জন্য একটি বিশেষ সেল গঠন করা উচিত।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকার রাস্তা ছাড়াই ব্রিজ বানানোর মতো প্রকল্প নেয় আর ব্যবসায়ীদের বলে টাকা নেই।
সংলাপে ড. তিতুমীর কর ফাঁকির মূলে ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা’ এবং ‘গোষ্ঠীতান্ত্রিক ক্ষমতা’কে দায়ী করেন। তিনি জানান, নাগরিক তখনই কর দিতে আগ্রহী হবে যখন সে বুঝতে পারবে করের বিনিময়ে রাষ্ট্র তাকে যথাযথ সেবা দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে আগামী বাজেট থেকেই একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেন তিনি। ভবিষ্যতে করদাতাদের এমন রসিদ দেওয়া হবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে তার দেওয়া করের ঠিক কত অংশ শিক্ষা, কত অংশ স্বাস্থ্য এবং কত অংশ সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা এনবিআরের হয়রানি ও ডিজিটাল অটোমেশনের অভাবকে বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেন। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, “এনবিআরের তিন বিভাগ আমাদের নাজেহাল করছে। প্রথমে কাস্টমসে অটোমেশন করতে হবে। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে দুর্নীতি যেমন কমবে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উন্নত হবে।”
সংলাপে অর্থনীতির আকার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, সরকার করের হার না বাড়িয়ে করজাল বিস্তৃত করতে চায়। এজন্য এসএমই নীতিমালা সংশোধন, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু এবং অনানুষ্ঠানিক খাতকে মূল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরির মাধ্যমে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ ধারণা বাস্তবায়নের কাজ চলছে, যা কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনবে।
আইসিএবি সভাপতি এন কে এ মবিন টেকসই রাজস্ব আহরণের জন্য প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর তাগিদ দেন। অন্যদিকে, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ উল্লেখ করেন যে, দেশে ১ কোটি ২০ লাখ করদাতা থাকলেও রিটার্ন দেন মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ লাখ। ই-ইনভয়েসিং পদ্ধতি চালু করলে ভ্যাট সংগ্রহ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি কামরান টি রহমান। আলোচনার শেষে উপদেষ্টা তিতুমীর স্পষ্ট করেন যে, বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে এবং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট করে।













