অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে অন্তত দুই বছর লাগবে: অর্থমন্ত্রী

Web Photo Card June 21 2026 CPD
ছবি: সিপিডি

দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুরোপুরি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে সরকারের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট করেন, দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ভঙ্গুর দশা থেকে স্থিতিশীলতায় যাবে, তৃতীয় বছর থেকে ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে সমৃদ্ধির দিকে এগোবে।

রবিবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাজেট সংলাপ ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি কর সংস্কৃতি পরিবর্তন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বড় সংস্কার এবং বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বিস্তৃত কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এবং সম্মানিত অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের বর্তমান কর সংস্কৃতির পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। অনেকেই কর না দেওয়াকে গর্বের বিষয় মনে করেন, আবার কেউ কেউ কর দিতে ভয় পান। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনায় করই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বর্তমানে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক, আইনজীবী, দোকানদার ও রেস্তোরাঁ মালিক কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন, যাদের করজালে আনতে একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে নামমাত্র করের মাধ্যমে কর ব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব খাতের বড় সংস্কারের ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন বিভাগ সম্পূর্ণ আলাদা করা হবে। এখন থেকে করনীতি প্রণয়ন করবেন বিশেষজ্ঞরা এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে প্রশাসনিক বিভাগ। এতে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দ্রুত বাড়ানো সহজ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বাইরে থেকে গ্যাস এনে সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অন্তত ১৮ মাস সময় লাগবে। তবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া ২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে আগামী জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে, যার মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি দৈনিক ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি ব্যবসা ও নাগরিক সেবায় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক ওয়েবসাইট চালু করা হবে।

তিনি আরও বলেন, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে বন্ড ও ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধা সহজ করা হয়েছে। এখন শুধু তৈরি পোশাক খাত নয়, যেকোনো রপ্তানিকারক এসব সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনায় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটে মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং ব্যক্তি আয়কর কাঠামোয় চরম বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

তিনি উপাত্ত তুলে ধরে বলেন, ৬ থেকে ১৫ লাখ টাকা করযোগ্য আয়কারীদের করের দায় ১২ দশমিক ৫ থেকে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে, অথচ ৩০ লাখ টাকার বেশি আয়কারীদের করের দায় বাড়ছে মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ তুলনামূলক বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাজেটে স্পষ্ট নয় এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাজেট ও নির্দিষ্ট সময়সীমা কেন ধরে রাখা যাচ্ছে না, সেসব সুনির্দিষ্ট সমস্যা ও সমাধান নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা বা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।

ঘোষিত নতুন বাজেটকে দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘অবাস্তব’ ও ‘ঘাটতি ও ঋণনির্ভর’ বলে উল্লেখ করেন এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার একটি স্বচ্ছ হিসাব যেন সময়ানুযায়ী সংসদ ও জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, মানুষের কাছে ঋণ এখন বিনিয়োগের নয়, বরং টিকে থাকার মাধ্যম হয়ে উঠেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ খাদ্য ব্যয় কমাচ্ছে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে এবং একাধিক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন। বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতি তিন মাস অন্তর প্রকাশেরও পরামর্শ দেন তিনি।

র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, দেশের মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে প্রায় অর্ধেক সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই ভয়ংকর বৈষম্য কমাতে কার্যকর সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর চালুর প্রয়োজন রয়েছে।

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলাম চৌধুরী বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যমান শিল্প টিকে থাকতে পারছে না। ব্যাংকের সুদের হার চড়া, সেটিও আরেক মাথাব্যাথা। এমন বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বিদ্যমান শিল্পগুলো টিকিয়ে রাখাই মূল বিষয়। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এখনো মব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে আমরা এখনো নিজেদের নিরাপদ মনে করছি না। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুবই আত্মতুষ্ট।’

এই বাজেটে শ্রমিকদের জীবনের পরিবর্তন হয়নি বলে মন্তব্য করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের রেশন দেওয়ার দাবি করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তাঁদের যে বেতন, তাতে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চলা সম্ভব নয়। কিন্তু বাজেটে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top