বাজেটে শর্ত প্রত্যাহার: দেশীয় বস্ত্র খাত ধ্বংসের আশঙ্কা বিটিএমএ’র

Web Photo Card June 20 2026 BTMABudget2026
ছবি: বিটিএমএ

প্রস্তাবিত বাজেটে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত প্রত্যাহারের ঘোষণা দেশীয় প্রাথমিক বস্ত্র খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিটিএমএ। সংগঠনটি বলছে, এই শর্ত প্রত্যাহার করা হলে বন্ড সুবিধার নজিরবিহীন অপব্যবহার এবং স্থানীয় বাজারে মারাত্মক অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। তাই দেশীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় এই আইনি বাধ্যবাধকতা পুনর্বহালসহ জরুরি চার দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

আজ শনিবার রাজধানীর গুলশান ক্লাবে আয়োজিত এক বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ নেতৃবৃন্দ দেশের প্রাথমিক বস্ত্র খাতের গভীর সংকট ও নজিরবিহীন রক্তক্ষরণের চিত্র তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, সাবেক পরিচালক রাজীব বাধা বা হায়দার, সাবেক সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন এবং বিজিএপিএমইএ সভাপতি মো. শাহরিয়ার।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বিটিএমএ’র সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার জানান, ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সুতা আমদানির আগ্রাসন, বন্ড সুবিধার অবাধ অপব্যবহার, জ্বালানি ও বিদ্যুতের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার, টাকার চরম অবমূল্যায়ন, কাঁচামালের অস্থির মূল্য এবং চলতি মূলধনের তীব্র সংকটের কারণে দেশের ২৩৪টি বস্ত্রকল বা মিল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, যার মধ্যে ১১৪টিই স্পিনিং মিল।

তিনি বলেন, বর্তমানে চালু থাকা অনেক কারখানা স্রেফ টিকে থাকার লড়াইয়ে তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে আসবাব, ইলেকট্রনিকস, চামড়াজাত ও প্লাস্টিক পণ্যসহ ১৮টি বিশেষ খাতকে শুল্কমুক্ত আমদানির ঢালাও সুবিধা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে দেবে।

এই সংকট থেকে ডুবতে থাকা স্পিনিং ও উইভিং খাতকে বাঁচাতে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট ৪টি দাবি পেশ করেছে বিটিএমএ। প্রথমত, ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানিতে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতার শর্তটি অবিলম্বে বহাল রাখতে হবে; কারণ এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক-সুবিধা ধরে রাখতে রুলস অব অরিজিন এবং দুই স্তরের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মতো কড়া শর্ত পূরণে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, একই সাপ্লাই চেইনের অংশ হওয়া সত্ত্বেও তৈরি পোশাক খাতের জন্য করপোরেট করহার ১২ শতাংশ, অথচ প্রাথমিক বস্ত্র খাতে কার্যকর আয়কর হার সাড়ে ২৭ শতাংশ, যা চরম বৈষম্যমূলক; তাই এই কর বৈষম্য দূর করে বস্ত্র খাতের করহার ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে তা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি জানানো হয়।

সংগঠনটির তৃতীয় দাবি হলো, পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (পিএসএফ) আমদানিতে প্রস্তাবিত ৫ শতাংশ শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা। বিটিএমএ জানায়, বিশ্ববাজারে ম্যান-মেড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাকের চাহিদা প্রায় ৭০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো মূলত তুলাভিত্তিক রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় কৃত্রিম আঁশের সুতা উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল পিএসএফ-এর ওপর নতুন করে ৫ শতাংশ শুল্ক বসালে স্থানীয় সুতা উৎপাদনের খরচ আরও বাড়বে এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ বাধাগ্রস্ত হবে।

চতুর্থত, নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সরকারি পদক্ষেপকে বিটিএমএ স্বাগত জানালেও, বর্তমানের তীব্র তারল্য সংকট বিবেচনায় এই উৎসে কর সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ মওকুফ বা শূন্য শতাংশ করার জোর দাবি জানিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সরকারের ৬০ হাজার কোটি টাকার ঢালাও প্রণোদনা ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘এই বিশাল অর্থ কাকে, কেন এবং কীভাবে দেওয়া হবে, তার কোনো স্পষ্ট পথনকশা বা রোডম্যাপ এখনো আমরা দেখিনি। সরকারকে আমরা বারবার বলেছি, পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা নেই বা কম, এমন খাতে অর্থায়ন করে কোনো সুফল মিলবে না; বরং টাকার অপচয় হবে।’

তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশেই উৎপাদনক্ষম ২৬ হাজার কোটি টাকার সুতা বাইরে থেকে আমদানি করা হয়েছে, যা দেশীয় শিল্পের বাজার কেড়ে নিয়েছে; তাই এই প্রণোদনার অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে সংকটে থাকা বস্ত্র খাতই সবচেয়ে বড় ও যৌক্তিক দাবিদার।

বিটিএমএ সভাপতি মনে করিয়ে দেন, এই খাতে ১,৮৭৮টি সদস্য মিলের মাধ্যমে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, যার সাথে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ এবং প্রায় এক কোটি মানুষের পরোক্ষ জীবিকা সরাসরি জড়িত। একই সাথে প্রতি বছর প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে এই খাত জাতীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তাই দেশীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে নীতিগত সহায়তা দিয়ে স্বনির্ভর করা কোনো একক খাতের বিষয় নয়, বরং এটি দেশের রপ্তানি আয় ধরে রাখা ও শিল্পায়নের ভিত্তি শক্তিশালী করার জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশল।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top