দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক তথ্যকে আরও নির্ভুল, বাস্তবসম্মত এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার লক্ষ্যে এক ব্যাপক সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই), মূল্যস্ফীতি, মজুরি হার সূচক এবং মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) গণনার বিদ্যমান পদ্ধতিতে বড় ধরনের এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দ্রুত দুটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি (টেকনিক্যাল) কমিটি গঠন করা হবে।
শুধু নতুন পদ্ধতি প্রবর্তনই নয়, বরং অতীতের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্যও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
শনিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মিলনায়তনে আয়োজিত সিপিআই, মূল্যস্ফীতি, মজুরি হার সূচক এবং জিডিপি প্রণয়নবিষয়ক এক নীতি নির্ধারণী মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সুশাসন ও সঠিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে বলেন, দেশের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের প্রধান ভিত্তিই হলো নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য। বর্তমান বাস্তবতায় জিডিপি এবং মূল্যস্ফীতির হিসাবকে আরও আধুনিক, বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতেই বিদ্যমান পুরো কাঠামো সংস্কারের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের খ্যাতনামা গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের সুচিন্তিত মতামত ও প্রত্যক্ষ পরামর্শের ভিত্তিতেই এই নতুন পরিসংখ্যানগত কাঠামো তৈরি করা হবে, যা দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র প্রতিফলনে সক্ষম হবে।
অতীতের পরিসংখ্যানগত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব অর্থনৈতিক উপাত্ত বা তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে কোথাও কোনো ধরনের অসঙ্গতি, ভুল বা তথ্যের বিকৃতি ছিল কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে। তবে এই তথ্য পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য কাউকে এককভাবে দায়ী করা বা রাজনৈতিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া নয়। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো অতীতের ভুলগুলো চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বিগত বছরগুলোতে সরকারি পরিসংখ্যান নিয়ে জনগণের মনে যে একধরনের আস্থার ঘাটতি বা আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, বাস্তবভিত্তিক ও নিখুঁত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে তা দূর করাই এই অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য।
যৌথ মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বর্তমান তথ্য সংগ্রহ ও হিসাব প্রক্রিয়ার একটি বিবরণ তুলে ধরেন। সভায় জানানো হয়, বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির সার্বিক হিসাবটি মোট ৭৪৯টি পণ্য ও সেবার বাজারদরের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। দেশের নির্দিষ্ট শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তিক বাজার থেকে বিবিএসের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সরাসরি তথ্যাদি সংগ্রহ করেন এবং কয়েক ধাপে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পর এই চূড়ান্ত হিসাবটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়।
তবে আধুনিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আরও উন্নত ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করে এই মূল্যস্ফীতির হিসাব করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভোগব্যয়ের নিখুঁত চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানে আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।
বিবিএসের শীর্ষ কর্মকর্তার জানান, নবগঠিত কারিগরি কমিটি দুটি খুব দ্রুতই বর্তমান সিপিআই এবং জিডিপি হিসাব পদ্ধতির বিস্তারিত পর্যালোচনা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ শুরু করবে। প্রাথমিক পর্যালোচনা শেষে তারা প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা জমা দেবে। সেই প্রাতিষ্ঠানিক সুপারিশ নিয়ে পরবর্তীতে আবারও সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এবং সবার সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে।
এদিনের উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন গবেষক ও নীতি নির্ধারকেরা অংশ নেন। তাঁরা পরিসংখ্যান আইন-২০১৩ সময়োপযোগী করে সংশোধন করা, দেশজুড়ে নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক জরিপ পরিচালনা করা, জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় বাজেটারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতিকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আরও শক্তিশালী করার জোর সুপারিশ করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মান, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারের নেওয়া উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো আরও বেশি লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর হবে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ জনগণের দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট দূর করতে সক্ষম হবে।













