দেশের ব্যাংকিং খাতের চরম ‘ক্যান্সার’ হিসেবে পরিচিত খেলাপি ঋণ এখন ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে উৎপাদনমুখী সব শিল্প খাতে। ব্যাংক খাতের অফিশিয়াল মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক তথা ৪৮ দশমিক ৫১ শতাংশই এখন কুক্ষিগত রয়েছে পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও জাহাজ নির্মাণসহ প্রধান প্রধান উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের বড় বড় উদ্যোক্তাদের পকেটে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৫’ পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে দেশের শিল্প খাতের এই ভয়ংকর ও রুগ্ণ চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে সর্বমোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশাল একটি অংশ অর্থাৎ ৫ লাখ ৫৭cy হাজার ৩২ কোটি টাকাই চূড়ান্ত খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে বিদেশে পাচার করার কারণেই শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের এই রেকর্ড উল্লম্ফন ঘটেছে।
উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা (মোট খেলাপি ঋণের ৪৯.৪৩ শতাংশ)। অথচ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণ ৯ লাখ ৩৪ thousand ৭৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছালেও খেলাপি ঋণের অঙ্ক জ্যামিতিক হারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ২০৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে দেশের শিল্প খাতের খেলাপি ঋণ এক ধাক্কায় ১ লাখ ৯০৫ কোটি টাকা বেড়েছে।
শিল্প খাতের মধ্যে বরাবরের মতোই সবচেয়ে বেশি ঋণ ও খেলাপির শীর্ষে রয়েছে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তৈরি পোশাক খাতে ১ লাখ ৯০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বিতরণের বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৫৯ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা, যা এক বছরে বেড়েছে ১০ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, টেক্সটাইল বা বস্ত্র খাতে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে ৪৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৬ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা বেশি।
চরম বিপর্যয় দেখা গেছে ব্যবসা, বাণিজ্য ও কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতেও। ২০২৫ সাল শেষে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ৩ লাখ ৩০ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকাই খেলাপি (২৯.৫৯ শতাংশ), যা এক বছরে বেড়েছে রেকর্ড ৭৬ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। এছাড়া কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতেও খেলাপি ঋণ এক বছরে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা থেকে ৪৩ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা বেড়ে ২০২৫ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৮০৯ কোটি টাকায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও খেলাপি ঋণের পাল্লা ভারী হয়েছে। ২০২৫ সাল শেষে চামড়া খাতে ১৪ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা বিতরণের বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৬ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা, যা এক বছরে ৫৫৭ কোটি টাকা বেড়েছে। একইভাবে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ২০ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে ৭ tracking হাজার ৫৫০ কোটি টাকাই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৪৮১ কোটি টাকা বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক তোষণ বন্ধ করে ঋণ আদায়ে কঠোর না হলে এই ক্যান্সার পুরো অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেবে।













