মূল্যস্ফীতির আগুনে বিদ্যুতের শক

Web Photo Card June 3 2026 DISCO
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

বৈশ্বিক ভূরাজনীতি আর অভ্যন্তরীণ তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের সাধারণ মানুষের আয় যখন স্থবির, ঠিক তখনই তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর আরেকটি বোঝা চাপালো সরকার। জ্বালানি তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই এবার একধাক্কায় রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম। গ্রাহক পর‌্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

আজ বুধবার (৩ জুন ২০২৬) বিইআরসি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বিদ্যুতের এই নতুন মেগা দাম ঘোষণা করেন, যা চলতি জুন মাসের বিলিং সাইকেল থেকেই দেশব্যাপী কার্যকর হচ্ছে।

তাড়াহুড়ো করে পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধির ফলে সেচ, শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহণ ও গৃহস্থালি—সব খাতেই খরচ আকাশচুম্বী হবে, যার সরাসরি প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম আরও একদফা বেড়ে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সংসার চালানোকে সম্পূর্ণ অসম্ভব করে তুলবে। গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এবার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে চরম সংকটে পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা।

ঘোষিত নতুন আদেশ অনুযায়ী, গ্রাহক বা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বা ইউনিট প্রতি ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন ধাপের (স্লাব) গ্রাহকদের মধ্যে সবচেয়ে কম ১৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে এবার। এর ফলে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায়।

ভোক্তাদের পকেট কাটার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বিইআরসি তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিশেষজ্ঞ দলের করা সুপারিশকেও ছাড়িয়ে গেছে। কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি) প্রাথমিকভাবে খুচরা বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি গড়ে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। মূল্যায়ন কমিটির মতে, এই মূল্য সমন্বয়ের ফলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা কমবে। তবে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগের কথা বিবেচনা না করে সরকার শেষ পর্যন্ত তার চেয়েও বেশি দাম বাড়ানোর পথেই হেঁটেছে।

সংবাদ সম্মেলনে তাড়াহুড়ো করে দাম বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ অবশ্য কোনো চাপের কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘বাজেট মাথায় রেখে দ্রুত করা হয়েছে। দাম বাড়ার ফলে মানুষের ব্যয় বাড়লেও এর কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এখনো করা হয়নি।’

খুচরা বাজারের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের পাইকারি পর্যায়েও ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে নজিরবিহীন দাম বাড়ানো হয়েছে। পাইকারিতে বিদ্যুতের বর্তমান গড় দাম প্রতি ইউনিট ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে এই পাইকারি দরে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। বিপিডিবি তাদের আবেদনে জানিয়েছিল, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা এবং প্রতি ইউনিটের উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াবে ১২ টাকা ৯১ পয়সার মতো। মূলত সেই ঘাটতি ও ভর্তুকির চাপ সাধারণ ভোক্তার কাঁধে চাপাতেই এই মূল্যবৃদ্ধি।

একই সাথে বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জও একধাক্কায় ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়িয়েছে বিইআরসি। এর ফলে সঞ্চালন খরচ ইউনিট প্রতি গড় ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। এর আগে সবশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি এক নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ এবং পাইকারি দর ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বর্তমান চরম মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। নতুন করে বিদ্যুতের এই ১৬.৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও কলকারখানার খরচ বাড়িয়ে দেবে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাকেই। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের টিকে থাকার লড়াই আরও দীর্ঘ ও কষ্টকর হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top