আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত ১৪ এপ্রিল তাদের সর্বশেষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালে বর্তমান মার্কিন ডলারের মূল্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতের তুলনায় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) -এর সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ২,৯১১ ডলার, যেখানে ভারতের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক হবে ২,৮১২ ডলার।
যদিও আয়ের এই ব্যবধান খুব সামান্য, কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতীকী হিসেবে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের অর্থনীতি আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আট গুণ বড়। ২০২৫ সালে ভারতের অর্থনীতির আকার ৩,৯১৬ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের জিডিপি মাত্র ৪৫৮ বিলিয়ন ডলার। এত বড় ব্যবধান সত্ত্বেও মাথাপিছু আয়ের এই পরিসংখ্যান বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ভারতের নীতিমহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ১৪ এপ্রিল আইএমএফ তাদের সর্বশেষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
মাথাপিছু আয়ে দুই দেশের এই ‘ছোঁয়াছুঁয়ি’ খেলা নতুন কিছু নয়। ১৯৮৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত টানা ১৩ বছর বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ে ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। এরপর ভারত প্রায় ১৫ বছর নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০১৮ সালে আবার বাংলাদেশের নিচে নেমে যায়। তবে ২০২৫ সালে এসে টাকার মান ডলারের বিপরীতে ব্যাপক কমে যাওয়ায় ভারত আবার সাময়িকভাবে এগিয়ে যায়। আইএমএফ বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ফের ১০০ ডলারের ব্যবধানে ভারতকে পেছনে ফেলবে। অবশ্য এই জয় দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে; কারণ ২০২৭ সালে ভারত আবার লিড নেবে এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত সেই ধারা বজায় রাখতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান ডলারের মূল্যে মাথাপিছু জিডিপি মূলত মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে। কোনো দেশের মুদ্রার মান ডলারের বিপরীতে বেশি কমে গেলে কাগজ-কলমে তাদের মাথাপিছু আয় কমে যায়। কিন্তু এটি দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রকৃত জীবনমান পুরোপুরি বোঝা যায় না। মানুষের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য ‘পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি’ বা পিপিপি ভিত্তিক মাথাপিছু আয় বেশি নির্ভরযোগ্য।
পিপিপি বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী হিসাব করলে দেখা যায়, ভারত সব সময়ই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল এবং বর্তমানেও আছে। ২০২৫ সালে ভারতের পিপিপি-ভিত্তিক মাথাপিছু আয় ১১,৭৮৯ ডলার, যা বাংলাদেশের (১০,২৭১ ডলার) তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। আইএমএফ-এর পূর্বাভাস বলছে, ২০৩১ সাল নাগাদ এই ব্যবধান আরও বেড়ে ২৪ শতাংশে দাঁড়াবে। তখন ভারতের পিপিপি আয় হবে ১৮,৪৮৫ ডলার এবং বাংলাদেশের হবে ১৪,৮৫৭ ডলার।
২০২৬ সালের এই প্রতীকী অর্জন বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তির প্রমাণ দিলেও বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধান একটি ভিন্ন বার্তাও দেয়। ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি বাংলাদেশের জন্য টাকার মান স্থিতিশীল রাখা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা মাথাপিছু আয়ের এই অর্জন ধরে রাখার প্রধান শর্ত।













