বিতর্কিতরাও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি হতে চাইছেন

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

দেশের ব্যাংকিং খাতের আলোচিত পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুতেই ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়েছে। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এই নিয়োগের সাক্ষাৎকারে এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক এমডি জাফর আলমসহ বেশ কয়েকজন বিতর্কিত ব্যাংকারের অংশগ্রহণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই সাক্ষাৎকারে প্রথম দিনে অংশ নেন মোট ছয়জন অভিজ্ঞ ব্যাংকার। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) সাবেক এমডি জাফর আলম। তিনি এমন এক সময়ে ব্যাংকটির শীর্ষ পদে ছিলেন, যখন চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটি থেকে ঋণের নামে প্রায় ১২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা বের করে নেওয়ার অভিযোগে জর্জরিত। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালে এক হোটেলে আয়োজিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও এমডিকে আটকের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপ এসআইবিএলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর জাফর আলম ব্যাংকটির লুটপাটে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিলেন। এস আলমমুক্ত হওয়ার পর তিনি চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

জাফার আলমের পাশাপাশি সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক এমডি নুরুদ্দিন মো. ছাদেক হোসেনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংকটিতে বিভিন্ন অনিয়ম চলাকালে তিনি এমডি হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। বিতর্কিতদের এভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের শীর্ষ পদের জন্য বিবেচনায় নেওয়ায় আর্থিক খাতের পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক মূলত সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত হচ্ছে। এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটি ব্যাংকই এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ৫ আগস্টের পর এস আলম গ্রুপ ও নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়া এসব ব্যাংককে টেনে তুলতেই একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু নতুন ব্যাংকের শুরুতেই এমন ব্যক্তিদের এমডি পদের দৌড়ে রাখা সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য গঠিত কমিটিতে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক আশরাফুল আলম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও অতিরিক্ত সচিব আজিমুদ্দিন বিশ্বাসসহ খাতসংশ্লিষ্ট আরও দুই বিশেষজ্ঞ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, প্রার্থীদের সম্পর্কে গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো সাক্ষাৎকার শুরুর আগমুহূর্তে হাতে এসেছে, যার ফলে অনেককে তাৎক্ষণিক বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বিতর্কিত ব্যক্তিরা যেন কোনোভাবেই চূড়ান্ত নিয়োগ না পান, সেদিকে কঠোর নজরদারি থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তারা।

এর আগে এই ব্যাংকের এমডি হিসেবে ইউসিবির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি যোগদান করেননি। একই সময়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া পদত্যাগ করায় একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটি হোঁচট খায়। এমতাবস্থায় যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বুধবার অংশ নেওয়া অন্যদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক হুমায়ুন কবির, সীমান্ত ব্যাংকের সাবেক এমডি রফিকুল ইসলাম, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের বাংলাদেশ প্রধান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এবং ইসলামী ব্যাংকের এসইভিপি জাকির হোসেন। বৃহস্পতিবার আরও ছয়জন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা রয়েছে।

সাক্ষাৎকার শেষে জাফর আলম তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে পজিটিভ প্রতিক্রিয়ার দাবি করলেও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, যারা অতীতে বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতি ও লুটপাত রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের হাতে নতুন কোনো ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হবে দেশের আর্থিক খাতের জন্য আত্মঘাতী।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top