দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৫৮%, দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ

ডিএসজে
ডিএসজে

ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে। কিন্তু অনেক খাতের মতো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের গতানুগতিক চেষ্টা বিফলে গিয়ে টানা চার মাস ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশ, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

রবিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাসিক হালনাগাদ ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর পরেই ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার বিদায় নেবে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সব চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, কিন্তু বাস্তব চিত্র তার উল্টো। জানুয়ারিতে খাদ্যপণ্যের দাম এক লাফে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিবিএস এর তথ্য বলছে, জানুয়ারিতে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। এর অর্থ, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যে পণ্য ১০০ টাকায় কেনা যেত, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কিনতে ভোক্তাকে খরচ করতে হচ্ছে ১০৮ টাকা ৫৮ পয়সা।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে খাবার কেনায়। ডিসেম্বরের ৭.৭১ শতাংশ থেকে এক লাফে জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.২৯ শতাংশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগামীতে আরও বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর ইজারা দেওয়ার চুক্তিকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতি চলছে। এই বন্দর দিয়ে ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে হতে যাওয়া চুক্তিকে কেন্দ্র করে গত সাত দিনেরও বেশি সময় শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে পুরো বন্দর অচল হয়ে পড়েছে।

নৌ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর গত শুক্র ও শনিবার বন্দর সচল হলেও আজ থেকে আবারও কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। এতে করে আমদানি করা খাদ্যপণ্য খালাস আটকে গেছে। সামনে রমজানের কারণে চাহিদা বাড়তি থাকলেও পণ্য খালাস আটকে যাওয়ায় দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আগামীতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার সম্ভবনা রয়েছে।

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লেও কিছুটা স্বস্তি মিলেছে খাদ্য-বহির্ভূত খাতে (পোশাক, বিদ্যুৎ, যাতায়াত)। এই খাতে মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশ থেকে কমে ৮.৮১ শতাংশে নেমেছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বরের পর থেকে মূল্যস্ফীতির পারদ ধারাবাহিকভাবে অস্থিতিশীল থেকেছে। গত সেপ্টেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিলো ৮.২০ শতাংশ। এরপরে অক্টোবরে তা বেড়ে গিয়ে ৮.৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়। নভেম্বর, ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮.৪০ ও ৮.৪৯ শতাংশে। জানুয়ারিতে তা আরও বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

টানা এই মূল্যস্ফীতির উর্দ্বগতি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দামি দেশে পরিণত করেছে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান তাদের চরম অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও বাংলাদেশ তা পারছে না।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে কম মূল্যস্ফীতি রয়েছে শ্রীলঙ্কায়, ৩.৮০ শতাংশ। মূলত দেশটির গভর্নের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও কার্যকরি পদক্ষেপের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এসেছে। গত জানুয়ারিতে ভারতে ৫.১০ শতাংশ, নেপালের ৫.২৫ শতাংশ ও পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ছিলো ৭.৫০ শতাংশ।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি ৬.৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার। এজন্য দীর্ঘসময় ধরে মূল্যস্ফীতি কমাতে টাকার লাগাম টানতে গিয়ে মুদ্রানীতিতে বার বার বাড়ানো হয়েছে নীতি সুদহার। তাতে ব্যাংকের ঋণের সুদহার বেড়ে ১৪-১৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

এ অবস্থায় বেসরকারি খাত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে দুই দশকের মধ্যে অর্থাৎ ২০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে বেসরকারী বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি।

গত ডিসেম্বর শেষে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গত দুই দশকের তথ্য অনুসারে, বেসরকারি খাতে এত কম প্রবৃদ্ধি আর কখনো দেখা যায়নি। এর আগে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির রেকর্ড ছিল গত বছরের অক্টোবরে ৬.২৩ শতাংশ।

যদিও মূল্যস্ফীতি কমানো ও বেসরকারি খাতকে চাঙা রাখাই বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেশ কিছু ভালো প্রতিষ্ঠানের ঋণও খারাপ হয়ে পড়ছে।

অবশ্য সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সুদহার বাড়ানো ছাড়াও বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার চাল, ডাল, চিনি ও তেলের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়েছে এবং টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি বাড়িয়েছে। তবুও বিশেষ করে শীত মৌসুমে সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়াকে সিন্ডিকেট ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান যেখানে মুদ্রানীতি ও সরবরাহ চেইন ঠিক করে সফল হয়েছে, বাংলাদেশে সেখানে উচ্চ আমদানিনির্ভরতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। নির্বাচনের আগে টাকার প্রবাহ এবং বাজার তদারকির অভাব মূল্যস্ফীতিকে ৮.৫৮ শতাংশে ঠেলে দিয়েছে, যা সাধারণ ভোটারদের জন্য বড় এক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top